ভালোবাসা: এক অদ্ভুত মধুর ও যন্ত্রণাদায়ক সংক্রামক ব্যাধি

in আমার বাংলা ব্লগyesterday

আসসালামু-আলাইকুম। আদাব - নমস্কার। মাতৃভাষা বাংলা ব্লগিং এর একমাত্র কমিউনিটি আমার বাংলা ব্লগ এর ভারতীয় এবং বাংলাদেশী সদস্যগণ, আশা করি সবাই ভাল আছেন।




ChatGPT Image Apr 19, 2026, 02_14_28 AM.png

চিকিৎসা বিজ্ঞানের বইয়ে অনেক ধরণের মরণব্যাধির কথা লেখা থাকে—ক্যান্সার, এইডস কিংবা কোনো সংক্রামক ভাইরাস। কিন্তু আমি আজ এমন এক রোগের কথা বলব, যার কোনো ল্যাবরেটরি টেস্ট নেই, নেই কোনো নির্দিষ্ট ভ্যাকসিন। এই রোগের নাম 'ভালোবাসা'। অনেকে একে স্বর্গীয় অনুভূতি বলেন, অনেকে বলেন জীবনের সার্থকতা। কিন্তু আমি আমার জীবনের পঁচিশটা বসন্ত পার করে যে অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছি, তাতে আমার মনে হয়েছে ভালোবাসা আসলে এক ধরণের মানসিক রোগ, যা মানুষকে ধীরে ধীরে ভেতর থেকে কুরে কুরে খায়। এটি এমন এক নেশা যা আফিমের চেয়েও ভয়ানক, আর এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কোনো বিষক্রিয়ার চেয়ে কম নয়।

আমার এই উপলব্ধির পেছনে রয়েছে এক দীর্ঘ যন্ত্রণার ইতিহাস। একটা সময় আমি বিশ্বাস করতাম ভালোবাসা মানেই পূর্ণতা। কিন্তু যখন আমি নিজে এই 'আক্রান্ত' হলাম, তখন দেখলাম এটি মানুষের স্বাভাবিক বিচারবুদ্ধিকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। ভালোবাসা যখন রক্তে মিশে যায়, তখন মানুষ আর নিজের থাকে না। সে হয়ে যায় অন্য কারো মর্জির দাস। একজন সুস্থ মানুষ যেভাবে তার জীবনের সিদ্ধান্ত নেয়, ভালোবাসায় আক্রান্ত মানুষটি তা পারে না। তার সকল আনন্দ, বিষণ্ণতা, এমনকি বেঁচে থাকার ইচ্ছাটুকুও ঝুলে থাকে সামনের মানুষটির একটি ফোন কল কিংবা একটা হাসির ওপর। এই যে নিজের ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ হারানো, একে কি আপনি সুস্থতা বলবেন? চিকিৎসা শাস্ত্র বলে, কোনো কিছুর ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীলতা এক ধরণের ডিসঅর্ডার। ভালোবাসা ঠিক সেই কাজটিই করে। এটি ডোপামিন আর অক্সিটোসিনের এমন এক জোয়ার তৈরি করে যে মস্তিষ্ক তখন আর যুক্তির ধার ধারে না।

আমার জীবনের সেই সময়টার কথা মনে পড়লে আজ হাসি পায়, আবার ভয়ও লাগে। আমি দেখতাম, দিনের পর দিন আমি না ঘুমিয়ে কাটিয়ে দিচ্ছি কেবল তার একটা বার্তার আশায়। খাওয়ার রুচি চলে গিয়েছিল, কাজে মন বসত না। বন্ধুদের আড্ডা থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিলাম। আমার জগতটা ছোট হতে হতে একটা মানুষের ভেতরেই সীমাবদ্ধ হয়ে গিয়েছিল। এই যে সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন আর নিদ্রাহীনতা—এগুলো কি কোনো কঠিন রোগের উপসর্গ নয়? অথচ আমরা একেই বলছি 'রোমান্টিকতা'। আমরা ভুলে যাই যে, ভালোবাসা যখন আসক্তিতে রূপ নেয়, তখন তা আর ভালোবাসা থাকে না; তা হয়ে দাঁড়ায় একটি ক্লিনিক্যাল ডিপ্রেশনের উৎস। যখন সেই ভালোবাসায় একটু টান পড়ে কিংবা প্রিয় মানুষটি অবহেলা করে, তখন শরীরের প্রতিটি কোষ যেন যন্ত্রণায় কুঁকড়ে যায়। এই শারীরিক কষ্টের কোনো ঔষধ কোনো ফার্মেসিতে পাওয়া যায় না।

ভালোবাসা নামক এই ব্যাধির সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো 'হ্যালুসিনেশন' বা বিভ্রম। আমরা যখন কাউকে ভালোবাসি, তখন আমরা সেই রক্ত-মাংসের মানুষটিকে ভালোবাসি না; বরং আমরা আমাদের মনের ভেতরে তার একটা কাল্পনিক প্রতিচ্ছবি তৈরি করি। আমরা তাকে নিখুঁত ভাবতে শুরু করি। তার দোষগুলো আমাদের চোখে পড়ে না। এই যে সত্যকে অস্বীকার করার প্রবণতা, এটি কি কোনো সুস্থ মনের পরিচয়? একজন স্কিজোফ্রেনিক রোগী যেমন বাস্তব আর কল্পনার পার্থক্য করতে পারে না, ভালোবাসায় মত্ত মানুষটিও তেমনি তার প্রিয়জনকে ঘিরে এক মায়াজাল বুনে চলে। আর যখন সেই মায়া ভেঙে যায়, তখন শুরু হয় এক ভয়ানক উইথড্রয়াল সিম্পটম। নেশাখোর যেমন নেশার দ্রব্য না পেলে ছটফট করে, ভালোবাসায় প্রত্যাখ্যাত মানুষটি ঠিক তেমনি হাহাকার করে। তার কাছে তখন জীবন অর্থহীন মনে হয়, সে আত্মহননের পথ বেছে নিতেও দ্বিধা করে না। প্রতিদিন সংবাদপত্রের পাতায় ভালোবাসার কারণে আত্মহত্যার খবরগুলো কি প্রমাণ করে না যে এটি একটি মরণব্যাধি?

আমি অনেক রাত কাটিয়েছে সিলিং ফ্যানের দিকে তাকিয়ে, ভেবেছি এই যন্ত্রণা থেকে মুক্তির উপায় কী। আমি বুঝতে পেরেছি, ভালোবাসা মানুষের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাকে দুর্বল করে দেয়। মানসিক শক্তি তিলে তিলে শেষ হয়ে যায়। আমরা যাকে আত্মত্যাগ বলি, গভীরভাবে দেখলে তা আসলে আত্মাহুতি। অন্যকে খুশি করতে গিয়ে নিজের সত্তাকে বিসর্জন দেওয়া কোনো সুস্থ চর্চা হতে পারে না। এই রোগটি সংক্রমণের মতো ছড়ায়। একজনের অবহেলা অন্যজনকে আক্রান্ত করে, সেই বিষ আবার ছড়িয়ে পড়ে চারপাশের মানুষের মাঝে। ভালোবাসা যখন একপাক্ষিক হয়ে যায়, তখন তা হয়ে ওঠে ক্যান্সারের মতো। এটি শরীরের ভেতর লুকিয়ে থাকে এবং শেষ পর্যন্ত তছনছ করে দেয় সবকিছু।

তবে প্রতিটি রোগের যেমন নিরাময় থাকে, ভালোবাসা নামক এই ব্যাধি থেকেও ফেরার পথ আছে। কিন্তু সেই পথ অত্যন্ত বন্ধুর। এর জন্য প্রয়োজন কঠিন আত্মনিয়ন্ত্রণ আর নিজের অস্তিত্বকে ফিরে পাওয়ার অদম্য ইচ্ছা। আমি আমার অভিজ্ঞতা থেকে শিখেছি যে, নিজেকে ভালোবাসার চেয়ে বড় কোনো প্রতিষেধক আর নেই। যতক্ষণ পর্যন্ত আপনি আপনার সুখের চাবিকাঠি অন্যের হাতে তুলে দেবেন, ততক্ষণ আপনি এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকবেন। আজ আমি যখন সুস্থভাবে পেছনে ফিরে তাকাই, তখন বুঝি সেই ভালোবাসা আসলে কোনো মহান অনুভূতি ছিল না; ওটা ছিল আমার মনের এক দুর্বল মুহূর্তের সংক্রমণ।

সবশেষে এটাই বলব, পৃথিবীকে ভালোবাসুন, মানুষকে শ্রদ্ধা করুন, কিন্তু 'ভালোবাসা' নামক সেই মরণব্যাধির কাছে নিজেকে সঁপে দেবেন না যা আপনাকে আপনার আপনজন, আপনার ক্যারিয়ার এবং আপনার সত্তা থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। সুস্থ থাকতে হলে আবেগ আর যুক্তির মধ্যে দেয়াল তোলা খুব জরুরি। ভালোবাসুন ঠিক ততটুকুই, যতটুকুতে আপনার মানসিক শান্তি বিঘ্নিত হবে না। কারণ দিনের শেষে, একটি অসুস্থ মনের চেয়ে একটি একা কিন্তু সুস্থ মন অনেক বেশি শক্তিশালী। ভালোবাসা যদি আপনাকে প্রতিনিয়ত কাঁদায়, যদি আপনার আত্মসম্মান ধূলিসাৎ করে, তবে জানবেন আপনি কোনো পবিত্র বন্ধনে নেই, বরং আপনি একটি গভীর মানসিক ব্যাধিতে আক্রান্ত। আর এই ব্যাধি থেকে মুক্তি পাওয়ার প্রথম ধাপ হলো স্বীকার করা যে—হ্যাঁ, আমি অসুস্থ এবং আমাকে সুস্থ হতে হবে।


সকলকে ধন্যবাদ অনুচ্ছেদ টি পড়ার জন্য।

1000038736.webp


Support @heroism Initiative by Delegating your Steem Power

250 SP500 SP1000 SP2000 SP5000 SP

Heroism_3rd.png

VOTE @bangla.witness as witness


witness_vote.png

OR

SET @rme as your proxy

witness_proxy_vote.png