সোশ্যাল মিডিয়া—সংযোগের ভিড়ে একাকীত্বের নতুন সংজ্ঞা
আসসালামু-আলাইকুম। আদাব - নমস্কার। মাতৃভাষা বাংলা ব্লগিং এর একমাত্র কমিউনিটি আমার বাংলা ব্লগ এর ভারতীয় এবং বাংলাদেশী সদস্যগণ, আশা করি সবাই ভাল আছেন।
একসময় একাকীত্ব মানে ছিল শারীরিকভাবে একা থাকা—বন্ধুদের সাথে দেখা না হওয়া, পরিবারের থেকে দূরে থাকা, কিংবা নিঃসঙ্গ কোনো বিকেল কাটানো। কিন্তু এখন বিষয়টা আর এতটা সরল নেই। এখন আমরা শত শত মানুষের মাঝে থেকেও একা অনুভব করি। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, কিংবা টিকটকে স্ক্রল করতে করতে অন্যদের হাসিখুশি মুহূর্তগুলো দেখে নিজের জীবনটাকে তুলনা করি। মনে হয়, সবাই যেন অনেক ভালো আছে, শুধু আমিই পিছিয়ে আছি। এই তুলনার বোধটাই ধীরে ধীরে একাকীত্বকে আরও তীব্র করে তোলে।
আমি নিজেও একসময় এই অনুভূতির মধ্যে দিয়ে গিয়েছি। রাতে ঘুমানোর আগে ফোনটা হাতে নিয়ে স্ক্রল করতাম। দেখতাম কেউ নতুন কোথাও ঘুরতে গেছে, কেউ সম্পর্কের সুন্দর মুহূর্ত শেয়ার করছে, কেউবা ক্যারিয়ারে বড় কিছু অর্জন করেছে। বাইরে থেকে সবকিছুই নিখুঁত মনে হতো। অথচ নিজের জীবনটা তখন খুব সাধারণ আর নিস্তেজ মনে হতো। সেই মুহূর্তে বুঝতাম না, কিন্তু এখন বুঝি—ওই ছবিগুলো ছিল শুধু জীবনের একটি অংশ, পুরো গল্পটা নয়।
সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের এমন এক দুনিয়া দেখায়, যেখানে সবাই তাদের জীবনের সেরা মুহূর্তগুলোই তুলে ধরে। দুঃখ, কষ্ট, ব্যর্থতা—এই দিকগুলো খুব কমই প্রকাশ পায়। ফলে আমরা একটা অবাস্তব মানদণ্ডের সাথে নিজেদের তুলনা করতে থাকি। আর এই তুলনা থেকেই জন্ম নেয় হীনমন্যতা, যা শেষ পর্যন্ত একাকীত্বে রূপ নেয়। মনে হয়, কেউ আমাকে বুঝতে পারে না, কেউ আমার মতো অনুভব করে না।
আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, আমরা ধীরে ধীরে বাস্তব যোগাযোগ থেকে দূরে সরে যাচ্ছি। আগে বন্ধুদের সাথে সরাসরি দেখা করে গল্প করা, একসাথে সময় কাটানো—এই জিনিসগুলোই ছিল সম্পর্কের মূল ভিত্তি। এখন সেই জায়গাটা অনেকটাই দখল করে নিয়েছে অনলাইন চ্যাট আর রিঅ্যাকশন। “Seen” বা “Like” দিয়ে আমরা ভাবি যোগাযোগটা হয়ে গেছে, কিন্তু আসলে গভীর সংযোগটা কোথাও হারিয়ে যাচ্ছে। ফলে, সম্পর্কগুলো থাকলেও তার গভীরতা কমে যাচ্ছে, আর একাকীত্বটা বাড়ছে।
তবে সোশ্যাল মিডিয়া পুরোপুরি খারাপ—এমনটাও বলা যায় না। অনেক সময় এটি একাকীত্ব দূর করতেও সাহায্য করে। যারা দূরে থাকে, তাদের সাথে যোগাযোগ রাখা সহজ হয়। নিজের অনুভূতি শেয়ার করার একটা প্ল্যাটফর্ম পাওয়া যায়। অনেক মানুষ আছেন, যারা সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমেই নতুন বন্ধু পেয়েছেন, নিজের কথা বলার জায়গা খুঁজে পেয়েছেন। কিন্তু সমস্যাটা তখনই শুরু হয়, যখন আমরা এই ভার্চুয়াল সংযোগকে বাস্তব সম্পর্কের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করি।
আমার মনে হয়, আসল সমস্যা সোশ্যাল মিডিয়াতে নয়—আমাদের ব্যবহার করার ধরনটাতে। যদি আমরা সচেতনভাবে ব্যবহার করি, তাহলে এটি আমাদের জীবনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। কিন্তু যদি অজান্তেই আমরা নিজেদের অন্যদের সাথে তুলনা করতে থাকি, কিংবা ভার্চুয়াল দুনিয়াকেই বাস্তব মনে করতে শুরু করি, তখনই একাকীত্বটা আমাদের ঘিরে ধরে।
একাকীত্ব কমানোর জন্য হয়তো খুব বড় কোনো পরিবর্তন দরকার নেই। ছোট ছোট কিছু অভ্যাসই অনেক কিছু বদলে দিতে পারে। যেমন—প্রতিদিন কিছু সময় ফোন থেকে দূরে থাকা, কাছের মানুষদের সাথে সরাসরি কথা বলা, নিজের অনুভূতিগুলো প্রকাশ করা। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, নিজের জীবনটাকে অন্য কারো জীবনের সাথে তুলনা না করা। কারণ প্রত্যেকের জীবনের গল্প আলাদা, এবং সেই গল্পের প্রতিটা অধ্যায়েরই নিজস্ব গুরুত্ব আছে।
শেষ পর্যন্ত, সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের একাকীত্বের সংজ্ঞা বদলে দিয়েছে—এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু এই পরিবর্তনটা আমাদের জন্য ইতিবাচক হবে না নেতিবাচক, সেটা অনেকটাই আমাদের হাতেই নির্ভর করে। আমরা চাইলে এই মাধ্যমকে ব্যবহার করে সত্যিকারের সংযোগ তৈরি করতে পারি, আবার চাইলে এর মাঝেই হারিয়েও যেতে পারি।
তাই হয়তো মাঝে মাঝে থেমে নিজেকে প্রশ্ন করা দরকার—আমি কি সত্যিই সংযুক্ত, নাকি শুধু সংযোগের ভিড়ে হারিয়ে গেছি? সেই প্রশ্নের উত্তরটাই হয়তো আমাদের একাকীত্বের প্রকৃত রূপটা বুঝতে সাহায্য করবে।
সকলকে ধন্যবাদ অনুচ্ছেদ টি পড়ার জন্য।


| 250 SP | 500 SP | 1000 SP | 2000 SP | 5000 SP |
VOTE @bangla.witness as witness

OR

