“চট্টগ্রাম বাণিজ্য মেলার সেই দিনগুলো — হারিয়ে যাওয়া শৈশবের সবচেয়ে সুন্দর স্মৃতি”
আসসালামু-আলাইকুম। আদাব - নমস্কার। মাতৃভাষা বাংলা ব্লগিং এর একমাত্র কমিউনিটি আমার বাংলা ব্লগ এর ভারতীয় এবং বাংলাদেশী সদস্যগণ, আশা করি সবাই ভাল আছেন।
শৈশবের কিছু স্মৃতি আছে, যেগুলো কখনো পুরোনো হয় না। সময় বদলায়, মানুষ বদলায়, জীবন বদলায়; কিন্তু সেই স্মৃতিগুলো বুকের ভেতর ঠিক আগের মতোই রঙিন হয়ে থেকে যায়। আমার ছোটবেলার সবচেয়ে প্রিয় স্মৃতিগুলোর মধ্যে একটি ছিল চট্টগ্রাম বাণিজ্য মেলায় ঘুরতে যাওয়া। সেই মেলার আলো, মানুষের ভিড়, খেলনার দোকান, গরম জিলাপির গন্ধ আর পরিবারের সবার সঙ্গে কাটানো মুহূর্তগুলো আজও মনে পড়লে বুকের ভেতর অদ্ভুত এক ভালো লাগা কাজ করে।ছোটবেলায় পুরো বছর জুড়ে একটা সময়ের জন্য অপেক্ষা করতাম—কবে বাণিজ্য মেলা শুরু হবে। মেলা মানেই ছিল আনন্দ, নতুন জামা, অনেক মানুষের ভিড় আর আব্বু-আম্মুর হাত ধরে ঘুরে বেড়ানো। তখন জীবনে এত চিন্তা ছিল না। ছোট ছোট জিনিসেই সুখ খুঁজে পেতাম। আর সেই সুখের সবচেয়ে বড় জায়গাগুলোর একটি ছিল এই মেলা।মেলায় যাওয়ার দিনটা ছিল যেন ঈদের দিনের মতো। সকাল থেকেই উত্তেজনা কাজ করত। বিকেলের দিকে সবাই প্রস্তুতি নিতাম। নতুন জামা পরে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখতাম, আর মনে মনে ভাবতাম আজ অনেক কিছু কিনবো। আব্বুর হাত শক্ত করে ধরে রিকশায় করে যখন মেলার দিকে যেতাম, তখন রাস্তার আলো আর মানুষের ভিড় দেখেই মনে হতো যেন অন্য এক জগতে চলে যাচ্ছি।মেলার গেটের সামনে পৌঁছানোর পর সেই বিশাল আলোকসজ্জা দেখে চোখ জুড়িয়ে যেত। গেটের সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তোলার জন্য সবাই কত ব্যস্ত থাকত! ভেতরে ঢুকতেই চারদিকে শুধু রঙিন আলো আর মানুষের কোলাহল। মাইকে গান বাজত, কোথাও খেলনার দোকান, কোথাও কাপড়ের স্টল, আবার কোথাও নানা ধরনের খাবারের গন্ধ। পুরো জায়গাটাই যেন ছোট্ট একটা আনন্দের শহর ছিল।সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ করত খেলনার দোকানগুলো। রঙিন গাড়ি, প্লাস্টিকের বন্দুক, পুতুল, বেলুন, বাঁশি—সবকিছুই তখন পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান জিনিস মনে হতো। একটা খেলনা কেনার জন্য আব্বুর কাছে কত আবদার করতাম! আব্বু মাঝে মাঝে না বললেও শেষ পর্যন্ত ঠিকই কিনে দিতেন। সেই ছোট্ট মুহূর্তগুলোই তখন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সুখ ছিল।আর ছিল নাগরদোলা। দূর থেকে যখন বিশাল নাগরদোলাটা ঘুরতে দেখতাম, বুকের ভেতর একসাথে ভয় আর আনন্দ কাজ করত। উপরে উঠলে পুরো মেলাটা ছোট ছোট আলোয় ভরা একটা শহরের মতো লাগত। বাতাস মুখে এসে লাগত, আর মনে হতো আমি যেন আকাশে উড়ছি। নিচে নামার পরও সেই অনুভূতি অনেকক্ষণ থেকে যেত।খাবারের অংশটাও ছিল মেলার সবচেয়ে মজার জায়গাগুলোর একটি। গরম গরম জিলাপি, ফুচকা, চটপটি, আইসক্রিম, ভুট্টা—সবকিছুর গন্ধ মিলেমিশে এক অন্যরকম পরিবেশ তৈরি করত। আম্মুর হাত ধরে দাঁড়িয়ে ফুচকা খাওয়ার সেই মুহূর্তগুলো এখনো চোখ বন্ধ করলে দেখতে পাই। তখন এত দাম, এত হিসাব কিছুই বুঝতাম না। শুধু বুঝতাম, আজকের দিনটা আনন্দের।মেলায় অনেক সময় বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও হতো। মঞ্চে গান চলত, মানুষ হাততালি দিত, ছোট ছোট বাচ্চারা দৌড়াদৌড়ি করত। পুরো জায়গাটা ছিল প্রাণে ভরা। এখনকার মতো সবাই তখন ফোন নিয়ে ব্যস্ত থাকত না। মানুষ সত্যি সত্যি মুহূর্তগুলো উপভোগ করত। পরিবার একসাথে সময় কাটাত, হাসত, গল্প করত। সেই সময়ের সম্পর্কগুলোতেও যেন বেশি উষ্ণতা ছিল।সবচেয়ে সুন্দর ব্যাপার ছিল পরিবারের সবাইকে একসাথে পাওয়া। এখন বড় হওয়ার পর বুঝি, তখনকার সেই সময়গুলো কত মূল্যবান ছিল। আব্বু-আম্মু হয়তো ক্লান্ত থাকতেন, তবুও আমাদের আনন্দ দেওয়ার জন্য পুরো মেলা ঘুরে দেখাতেন। নিজেদের জন্য কিছু না কিনে আমাদের জন্য খেলনা, খাবার, জামা কিনে দিতেন। তখন বুঝিনি, এখন বুঝি—ওই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোর পেছনে কত ভালোবাসা লুকিয়ে ছিল।আজ যখন আবার বাণিজ্য মেলার পাশ দিয়ে যাই, তখন আগের সেই ছোট্ট আমিটাকে খুব মনে পড়ে। এখন মেলায় গেলে আগের মতো উত্তেজনা কাজ করে না। সবকিছু যেন বদলে গেছে। হয়তো মেলাও আগের চেয়ে বড় হয়েছে, আধুনিক হয়েছে, কিন্তু সেই শৈশবের সরল আনন্দটা আর নেই। এখন মানুষের হাতে ফোন বেশি, সময় কম। আগের মতো আবেগ নিয়ে কেউ মেলা ঘুরে না।সবচেয়ে বেশি কষ্ট হয় তখন, যখন বুঝি সেই দিনগুলো আর কখনো ফিরে আসবে না। সেই ছোট্ট বয়স, সেই আবদার, সেই নির্ভেজাল আনন্দ—সবকিছুই এখন শুধু স্মৃতি। জীবন যত সামনে এগিয়েছে, ততই বুঝেছি শৈশব আসলে জীবনের সবচেয়ে সুন্দর অধ্যায় ছিল। আর চট্টগ্রাম বাণিজ্য মেলার স্মৃতিগুলো সেই অধ্যায়ের সবচেয়ে রঙিন অংশগুলোর একটি।আজও রাতে কখনো পুরোনো কথা মনে পড়লে চোখের সামনে ভেসে ওঠে রঙিন আলোয় ভরা সেই মেলা, আব্বুর হাত, আম্মুর ডাক, নাগরদোলার ঘূর্ণন আর হাতে ধরা ছোট্ট একটা বেলুন। তখন মনে হয়, মানুষ আসলে বড় হয়ে যায় শরীরে, কিন্তু ভেতরে কোথাও সেই ছোট্ট শিশুটাই বেঁচে থাকে—যে আজও চট্টগ্রাম বাণিজ্য মেলার সেই দিনগুলো খুঁজে বেড়ায়।
সকলকে ধন্যবাদ অনুচ্ছেদ টি পড়ার জন্য।


Support @heroism Initiative by Delegating your Steem Power
| 250 SP | 500 SP | 1000 SP | 2000 SP | 5000 SP |
VOTE @bangla.witness as witness

OR

