The Color of Paradise (1999): একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী বালক কীভাবে ..
আসসালামু-আলাইকুম। আদাব - নমস্কার। মাতৃভাষা বাংলা ব্লগিং এর একমাত্র কমিউনিটি আমার বাংলা ব্লগ এর ভারতীয় এবং বাংলাদেশী সদস্যগণ, আশা করি সবাই ভাল আছেন।



মাজিদ মজিদির 'দ্য কালার অফ প্যারাডাইস' (The Color of Paradise) বা মূল ফার্সি ভাষায় 'রং-এ খোদা' (ঈশ্বরের রং) কেবল একটি সিনেমা নয়; এটি এমন এক আধ্যাত্মিক যাত্রা, যা দেখার পর দীর্ঘক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে থাকতে হয়। ছবিটি দেখার অভিজ্ঞতা যেন নিজের আত্মার ভেতরে উঁকি দেওয়ার মতো। আজ আমি আপনাদের এই অসাধারণ সিনেমাটির গল্প এমনভাবে শোনাব, যেন আপনারা আমার চোখ দিয়ে, বা আরও ভালো করে বললে, ছবির ছোট্ট অন্ধ নায়ক মোহাম্মদের হৃদয় দিয়ে গল্পটি অনুভব করছেন।
শুরু: অপেক্ষার প্রহর এবং অন্ধকারের আলো
গল্পের শুরু তেহরানের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিশুদের একটি স্কুলে। গ্রীষ্মের ছুটি শুরু হয়ে গেছে। একে একে সব বাচ্চাকে তাদের বাবা-মা এসে হাসিমুখে বাড়ি নিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আট বছরের ছোট্ট ছেলে মোহাম্মদ একা বসে আছে। তার কান সজাগ, সে প্রতিটি পায়ের শব্দ শুনছে আর ভাবছে, এই বুঝি তার বাবা এল! কিন্তু তার বাবা হাশেম আসে না। সে সবার শেষে আসে, আর আসে চরম অনিচ্ছা নিয়ে।হাশেম একজন বিপত্নীক মানুষ। সে নতুন করে বিয়ে করতে চায়, নতুন জীবন শুরু করতে চায়। কিন্তু তার চোখে তার নিজের সন্তান মোহাম্মদ এক বিরাট অভিশাপ, এক ভারী বোঝা। হাশেম স্কুল কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করে মোহাম্মদকে স্কুলেই রেখে দেওয়ার জন্য, কারণ সে অন্ধ ছেলেকে নিয়ে গ্রামে ফিরতে চায় না। কিন্তু স্কুল রাজি হয় না। অগত্যা একরাশ বিরক্তি আর হতাশা নিয়ে হাশেম ছেলেকে নিয়ে গ্রামের পথ ধরে।প্রকৃতির মাঝে ঈশ্বরকে খোঁজা: মোহাম্মদের অদ্ভুত পৃথিবী তেহরানের কোলাহল ছেড়ে তারা যখন উত্তর ইরানের পাহাড়ি গ্রামে ফেরে, সিনেমাটি যেন এক জাদুকরী রূপ নেয়। মোহাম্মদ চোখে দেখতে পায় না ঠিকই, কিন্তু সে প্রকৃতিকে যেভাবে অনুভব করে, তা একজন দৃষ্টিমান মানুষের পক্ষেও সম্ভব নয়। তার জগত অন্ধকার নয়, বরং শব্দ, স্পর্শ আর অনুভূতির এক অদ্ভুত ক্যানভাস।
বনের ভেতর দিয়ে হাঁটার সময় মোহাম্মদ যখন গাছের পাতা ছোঁয়, ঝরে পড়া শস্যদানা কুড়িয়ে পাখির বাসায় রেখে আসে, কিংবা নদীর জলের শব্দ শোনে, তখন মনে হয় সে যেন প্রকৃতির প্রতিটি উপাদানের সাথে কথা বলছে। সে ব্রেইল পদ্ধতিতে পড়া শিখেছে। তাই সে গাছের পাতা, পাথরের খাঁজ, আর নদীর নুড়ি ছুঁয়ে ছুঁয়ে যেন প্রকৃতির ব্রেইল পড়ার চেষ্টা করে। সে বিশ্বাস করে, এই প্রকৃতির মাঝেই মহান আল্লাহ লুকিয়ে আছেন। তার শিক্ষক তাকে বলেছেন, "ঈশ্বর অন্ধদের বেশি ভালোবাসেন, কারণ তারা ঈশ্বরকে দেখতে পায় না, কিন্তু তাকে ছুঁতে পারে।" মোহাম্মদ তাই তার ছোট্ট হাত দিয়ে সারা পৃথিবী ছুঁয়ে ঈশ্বরকে খোঁজার চেষ্টা করে।গ্রামের জীবন: ভালোবাসার আশ্রয় এবং বাবার অবহেলা গ্রামে ফিরে মোহাম্মদ তার দাদি (যাকে সে 'আজিজ' বলে ডাকে) এবং দুই বোনের কাছে ফিরে যায়। আজিজ এক অসাধারণ চরিত্র—স্নেহময়ী, গভীরভাবে আধ্যাত্মিক এবং মোহাম্মদের প্রতি সীমাহীন ভালোবাসায় পূর্ণ। বোনেরা মোহাম্মদকে খুব ভালোবাসে। প্রকৃতির কোলে, দাদির আদরে আর বোনেদের সান্নিধ্যে মোহাম্মদ খুব সুখে থাকে।কিন্তু হাশেমের ভেতরে এক নিদারুণ যন্ত্রণা আর লজ্জা কাজ করে। সে গ্রামের এক ধনী পরিবারের মেয়ের সাথে বিয়ের স্বপ্ন দেখছে। সে ভয় পায়, পাত্রীর পরিবার যদি তার এই অন্ধ ছেলের কথা জানতে পারে, তবে বিয়েটা ভেঙে যাবে। তাই সে মোহাম্মদকে সবার চোখের আড়ালে লুকিয়ে রাখতে চায়। হাশেম কোনো খারাপ মানুষ নয়, সে কেবল জীবনের চাপে পিষ্ট, হতাশ এবং নিজের স্বার্থের কাছে অন্ধ একজন মানুষ। মোহাম্মদের শারীরিক অন্ধত্বের চেয়ে হাশেমের আত্মিক অন্ধত্বই যেন ছবিতে বেশি প্রকট হয়ে ওঠে। নির্বাসন: এক অন্ধ ছুতোরের কাছে হাশেম এক চরম সিদ্ধান্ত নেয়। সে মোহাম্মদকে গ্রাম থেকে দূরে এক অন্ধ কাঠমিস্ত্রির (ছুতোর) কাছে রেখে আসার সিদ্ধান্ত নেয়, যাতে সে সেখানে কাজ শিখতে পারে এবং হাশেমের বিয়ের পথে আর কোনো বাধা না থাকে। মোহাম্মদ বুঝতে পারে যে তার বাবা তাকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে।কাঠমিস্ত্রির কাছে রেখে আসার পর মোহাম্মদের সেই কান্নার দৃশ্যটি যেকোনো মানুষের হৃদয় চুরমার করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। সে ডুকরে কাঁদতে কাঁদতে অন্ধ মিস্ত্রিকে বলে, "কেউ আমাকে ভালোবাসে না। আমার দাদিও আমাকে ভালোবাসে না, বাবাও না। ঈশ্বর আমাকে অন্ধ করে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন যাতে আমি তাকে দেখতে না পাই। কিন্তু আমার শিক্ষক বলেছেন ঈশ্বর নাকি অন্ধদের বেশি ভালোবাসেন। আমি ঈশ্বরের কাছে পৌঁছাতে চাই, তাকে ছুঁতে চাই, আর আমার মনের সব কষ্টের কথা তাকে বলতে চাই।"অন্ধকার পৃথিবীতে এক ছোট্ট শিশুর এই আকুতি যেন সরাসরি ঈশ্বরের আরশ পর্যন্ত পৌঁছে যায়। মিস্ত্রি তাকে সান্ত্বনা দেয়, কিন্তু মোহাম্মদের ভেতরের একাকিত্ব ঘোচে না।দাদির মৃত্যু এবং ভেঙে যাওয়া স্বপ্ন এদিকে হাশেমের এই নিষ্ঠুর আচরণে আজিজ (দাদি) গভীরভাবে আঘাত পান। তিনি বাড়ি ছেড়ে চলে যান, কিন্তু পথিমধ্যে অসুস্থ হয়ে পড়েন। হাশেম তাকে ফিরিয়ে আনলেও কিছুদিন পর দাদি মারা যান। দাদির এই মৃত্যু হাশেমের জীবনের সব হিসাব-নিকাশ উল্টে দেয়। পাত্রীর পরিবার এই মৃত্যুকে 'অশুভ লক্ষণ' হিসেবে ধরে নেয় এবং বিয়ে ভেঙে দেয়। হাশেম যেন তার নিজের কর্মের ফল ভোগ করতে শুরু করে। সে তার অন্ধ ছেলেকে দূরে সরিয়েও তার কাঙ্ক্ষিত সুখ পেল না।
চূড়ান্ত পরিণতি: নদীর ভয়াল স্রোত এবং জীবনের পরীক্ষা দাদির মৃত্যুর পর এবং বিয়ে ভেঙে যাওয়ার হতাশায় হাশেম পুনরায় কাঠমিস্ত্রির কাছে যায় মোহাম্মদকে ফিরিয়ে আনতে। বাবা আর ছেলে ঘোড়ায় চড়ে বনের ভেতর দিয়ে বাড়ির পথে রওনা হয়। পথিমধ্যে তাদের একটি পাহাড়ি নদী পার হতে হয়। নদীর ওপর একটি পুরনো, নড়বড়ে কাঠের ব্রিজ। নদীর স্রোত তখন ভয়ংকর, বৃষ্টির কারণে জল ফুলে ফেঁপে উঠেছে।ব্রিজ পার হওয়ার সময় হঠাৎ কাঠের তক্তা ভেঙে যায় এবং মোহাম্মদ তার ঘোড়াসহ সেই ভয়াল স্রোতের মাঝে পড়ে যায়। এই মুহূর্তটি সিনেমার সবচেয়ে শ্বাসরুদ্ধকর এবং দার্শনিক মুহূর্ত। হাশেম ব্রিজের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। সে কয়েক সেকেন্ডের জন্য থমকে যায়। তার মনের ভেতর এক অদ্ভুত দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। যদি মোহাম্মদ এই নদীতে ডুবে মারা যায়, তবে তার জীবনের সবচেয়ে বড় "বোঝা" চিরতরে দূর হয়ে যাবে। সে এক মুহূর্তের জন্য সেই পৈশাচিক চিন্তায় স্থির হয়ে থাকে।কিন্তু পরক্ষণেই তার ভেতরের পিতৃসত্তা, তার মানবতা জেগে ওঠে। সে নিজের জীবনের মায়া ত্যাগ করে সেই উন্মত্ত নদীর স্রোতে ঝাঁপ দেয় তার অন্ধ ছেলেকে বাঁচানোর জন্য। প্রকৃতির রুদ্ররোষে বাবা ও ছেলে দুজনেই খড়কুটোর মতো ভেসে যায়।
শেষ দৃশ্য: ঈশ্বরের স্পর্শ
সিনেমার শেষ দৃশ্যটি কাস্পিয়ান সাগরের তীরে। জ্ঞান ফেরার পর হাশেম দেখে সে বালুচরে পড়ে আছে। সে পাগলের মতো চারদিকে খুঁজতে থাকে তার ছেলেকে। একটু দূরেই সে দেখতে পায় মোহাম্মদের নিথর দেহ পড়ে আছে।হাশেম দৌড়ে যায়, ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরে ডুকরে কেঁদে ওঠে। তার সেই কান্না যেন তার এতদিনের সব পাপ, সব অবহেলা আর আত্মিক অন্ধত্বের প্রায়শ্চিত্ত। সে বুঝতে পারে, এই ছেলেটি তার জীবনের বোঝা ছিল না, বরং তার জীবনের আশীর্বাদ ছিল, ঈশ্বরের এক রূপ ছিল।হাশেম যখন মোহাম্মদকে বুকে জড়িয়ে কাঁদছে, তখন ধীরে ধীরে ক্যামেরা মোহাম্মদের হাতের দিকে জুম করে। যে হাত দিয়ে সে সারাজীবন ব্রেইল পদ্ধতিতে ঈশ্বরকে খুঁজত, সেই হাতের আঙুলগুলো হঠাৎ মৃদু নড়ে ওঠে। আর সেই মুহূর্তে তার হাতের তালুতে এসে পড়ে সূর্যের এক সোনালী, স্বর্গীয় আলো।সিনেমাটি এখানেই শেষ হয়। মোহাম্মদ বেঁচে ফিরল কি না, তা পরিচালক আমাদের সরাসরি জানান না। কিন্তু সেই সোনালী আলো আমাদের এই বার্তা দিয়ে যায় যে, মোহাম্মদ অবশেষে ঈশ্বরকে ছুঁতে পেরেছে। সে ঈশ্বরের যে রূপ, যে রং খুঁজছিল, সে তা পেয়ে গেছে।'দ্য কালার অফ প্যারাডাইস' আমাদের শেখায় যে, সত্যিকারের অন্ধত্ব চোখে নয়, বরং হৃদয়ে থাকে। হাশেমের চোখ ছিল, কিন্তু সে জীবনের সৌন্দর্য ও ঈশ্বরের আশীর্বাদ দেখতে পায়নি। অন্যদিকে মোহাম্মদ অন্ধ হয়েও তার হৃদয় দিয়ে প্রকৃতির মাঝে, ভালোবাসার মাঝে স্রষ্টাকে ঠিকই অনুভব করতে পেরেছিল।
সকলকে ধন্যবাদ অনুচ্ছেদ টি পড়ার জন্য।


| 250 SP | 500 SP | 1000 SP | 2000 SP | 5000 SP |
VOTE @bangla.witness as witness

OR


This post has been upvoted by @italygame witness curation trail
If you like our work and want to support us, please consider to approve our witness
Come and visit Italy Community