আমার দেখা -The Message (১৯৭৬)

in আমার বাংলা ব্লগ6 hours ago

আসসালামু-আলাইকুম। আদাব - নমস্কার। মাতৃভাষা বাংলা ব্লগিং এর একমাত্র কমিউনিটি আমার বাংলা ব্লগ এর ভারতীয় এবং বাংলাদেশী সদস্যগণ, আশা করি সবাই ভাল আছেন।



The Message_ Epic moments captured.png

কিছু সিনেমা আছে যেগুলো শুধু দেখা হয় না—অনুভব করা হয়। The Message আমার কাছে ঠিক তেমনই একটি চলচ্চিত্র। আমি যখন প্রথমবার এটি দেখলাম, তখন বুঝিনি যে প্রায় তিন ঘণ্টার এই ঐতিহাসিক সিনেমা আমার ভেতরে এত গভীর প্রভাব ফেলবে। কিন্তু ধীরে ধীরে গল্প এগোতে থাকলে আমি যেন নিজেকে সপ্তম শতকের মরুভূমির সেই সময়ের মধ্যে খুঁজে পেলাম—একটা নতুন সত্যের সূচনা, একদল মানুষের সংগ্রাম, আর ঈমানের জন্য অকল্পনীয় ত্যাগের ইতিহাস।এই চলচ্চিত্রটি ইসলামের সূচনাকাল ও রাসূলুল্লাহ (সা.)–এর দাওয়াতি জীবন নিয়ে নির্মিত। যদিও চলচ্চিত্রে নবীজি (সা.)–কে সরাসরি দেখানো হয়নি, তবু ইসলামের সংগ্রাম, ত্যাগ ও ঈমানের শক্তি খুব সুন্দরভাবে তুলে ধরা হয়েছে। এই সিনেমা দেখলে বোঝা যায়, কষ্টের মধ্য দিয়েই সত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি হৃদয়ে ঈমানের দৃঢ়তা সৃষ্টি করে।সবচেয়ে অবাক করার বিষয় হলো, পুরো সিনেমাজুড়ে রাসূলুল্লাহ (সা.)–কে সরাসরি দেখানো হয় না। প্রথমে মনে হয়েছিল, এতে হয়তো আবেগের ঘাটতি থাকবে। কিন্তু সিনেমা যত এগোয়, আমি বুঝতে পারলাম—এই অনুপস্থিতিই চলচ্চিত্রটিকে আরও শক্তিশালী করেছে। ক্যামেরা যখন তাঁর দৃষ্টিকোণ থেকে দৃশ্য দেখায়, অথবা অন্য চরিত্ররা তাঁর কথা শুনে আবেগে কেঁপে ওঠে, তখন মনে হয়—তিনি আছেন, কিন্তু আমাদের দৃষ্টির আড়ালে। এই সম্মানজনক উপস্থাপন আমাকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছে।চলচ্চিত্রের শুরুতেই মক্কার সমাজব্যবস্থার যে চিত্র দেখানো হয়েছে—মূর্তিপূজা, গোত্রীয় অহংকার, নারীর অবমাননা, দাসপ্রথা—তা দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিল, মানুষ কত সহজেই অন্ধকারে ডুবে যেতে পারে। কিন্তু ঠিক সেই অন্ধকারের মাঝেই আলোর সূচনা হয়। যখন ইসলামের প্রথম আহ্বান আসে, তখন সেই দৃশ্যগুলোতে একধরনের নিঃশব্দ শক্তি কাজ করে। কোনো নাটকীয় অতিরঞ্জন নেই; আছে দৃঢ়তা ও বিশ্বাসের স্বচ্ছ প্রকাশ।বিশেষ করে হযরত বিলাল (রা.)–এর চরিত্র আমাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। উত্তপ্ত মরুভূমির বালির ওপর তাঁকে শায়িত করে নির্যাতন করার দৃশ্যগুলো আমি সহজে ভুলতে পারিনি। তাঁর মুখে বারবার উচ্চারিত “আহাদ, আহাদ”—এই শব্দ দুটো যেন কানে বাজতেই থাকে। সেই দৃশ্যগুলোতে আমি শুধু একজন দর্শক ছিলাম না; আমি যেন তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে ছিলাম, তাঁর কষ্ট অনুভব করছিলাম। একজন দাস, যার কোনো সামাজিক ক্ষমতা নেই, কিন্তু যার ঈমান পাহাড়ের মতো দৃঢ়—এই চিত্র আমাকে লজ্জিতও করেছে, অনুপ্রাণিতও করেছে।হামজা (রা.)–এর চরিত্রও ছিল অসাধারণ শক্তিশালী। তাঁর দৃঢ়তা, সাহস আর ইসলামের প্রতি আনুগত্য দেখে মনে হয়েছে—ঈমান মানুষকে কতটা বদলে দিতে পারে। বদরের যুদ্ধের দৃশ্যগুলোতে আমি শ্বাসরুদ্ধ হয়ে বসেছিলাম। যুদ্ধের কৌশল, উত্তেজনা, আর সংখ্যায় কম হয়েও মুসলমানদের আত্মবিশ্বাস—সব মিলিয়ে সেই অংশটি ছিল অত্যন্ত আবেগময়। বিশেষ করে যখন বিজয় আসে, তখন মনে হয়—এটা কেবল একটি যুদ্ধের জয় নয়; এটি সত্যের জয়।চলচ্চিত্রটির সংগীত ও সিনেমাটোগ্রাফি আমার অভিজ্ঞতাকে আরও গভীর করেছে। মরুভূমির বিস্তীর্ণ প্রান্তর, সূর্যাস্তের আলো, মক্কার কাবাঘর—সবকিছু এত সুন্দরভাবে ধারণ করা হয়েছে যে মনে হয়েছিল আমি ইতিহাসের এক জীবন্ত অধ্যায় দেখছি। সংগীতের সুর কখনো উদ্দীপক, কখনো বেদনাময়—কিন্তু সব সময়ই গল্পের সঙ্গে মানানসই।তবে এই সিনেমা শুধু যুদ্ধ বা ঐতিহাসিক ঘটনার গল্প নয়। এটি মূলত ধৈর্য, সহনশীলতা ও নৈতিকতার গল্প। যখন মুসলমানরা নির্যাতিত হচ্ছিল, তখন তাদের ধৈর্য আমাকে ভাবিয়েছে—আমরা আজ সামান্য কষ্টেই ভেঙে পড়ি, অথচ তারা ঈমানের জন্য সবকিছু ত্যাগ করেছিলেন। আবিসিনিয়ায় হিজরতের দৃশ্যগুলোতে আমি একধরনের আশার আলো দেখেছি—অত্যাচারের মাঝেও আল্লাহ তাঁর বান্দাদের জন্য পথ খুলে দেন।মদিনায় হিজরতের অংশটিও ছিল অত্যন্ত আবেগঘন। একটি নতুন সমাজ গঠনের সূচনা—ভ্রাতৃত্ব, ন্যায়বিচার ও আল্লাহভীতির ভিত্তিতে। আমি ভাবছিলাম, যদি আজকের পৃথিবীতে সেই আদর্শের সামান্য অংশও বাস্তবায়িত হতো, তাহলে সমাজ কতটা বদলে যেত!সিনেমার শেষের দিকে মক্কা বিজয়ের দৃশ্য আমাকে সবচেয়ে বেশি আলোড়িত করেছে। এত নির্যাতন, এত কষ্টের পরও যখন প্রতিশোধ না নিয়ে ক্ষমা ঘোষণা করা হয়, তখন আমি সত্যিই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছিলাম। এটি আমাকে শিখিয়েছে—ক্ষমাই সবচেয়ে বড় শক্তি। প্রতিশোধ নেওয়া সহজ; কিন্তু ক্ষমা করা কঠিন। আর সেই কঠিন কাজটিই ইসলামের সৌন্দর্যকে সবচেয়ে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।একজন সাধারণ দর্শক হিসেবে আমি বলতে পারি, The Message শুধু একটি ঐতিহাসিক চলচ্চিত্র নয়; এটি একটি আত্মজাগরণের অভিজ্ঞতা। এটি আমাকে আমার ঈমান নিয়ে ভাবতে বাধ্য করেছে। আমি কি সত্যিই আমার বিশ্বাসের জন্য ত্যাগ স্বীকার করতে প্রস্তুত? আমি কি ধৈর্য ধরতে পারি? আমি কি ক্ষমা করতে পারি? এই প্রশ্নগুলো সিনেমা শেষ হওয়ার পরও আমাকে ছাড়েনি।চলচ্চিত্রটির গতি কিছু অংশে ধীর মনে হতে পারে, বিশেষ করে যারা আধুনিক দ্রুতগতির সিনেমায় অভ্যস্ত তাদের কাছে। কিন্তু আমার কাছে এই ধীর গতি বরং একধরনের গভীরতা এনেছে। এটি আমাকে সময় নিয়ে ভাবতে শিখিয়েছে, প্রতিটি দৃশ্য অনুভব করতে সুযোগ দিয়েছে।
    সবশেষে বলতে চাই, The Message আমার কাছে কেবল একটি সিনেমা নয়—এটি এক ইতিহাসের দরজা, এক আত্মসমালোচনার আয়না। এটি আমাকে মনে করিয়ে দিয়েছে, ইসলামের সূচনা কত ত্যাগ ও সংগ্রামের মাধ্যমে হয়েছে। আজ আমরা যে ঈমান সহজভাবে ধারণ করি, তার পেছনে রয়েছে অসংখ্য অশ্রু, রক্ত ও ধৈর্যের গল্প।আমি যখন সিনেমাটি শেষ করলাম, তখন মনে হচ্ছিল—আমার ভেতরে কিছু একটা বদলে গেছে। হয়তো আমি সম্পূর্ণ বদলাইনি, কিন্তু অন্তত নিজের বিশ্বাসকে আরও গভীরভাবে অনুভব করেছি। আর একজন মানুষ হিসেবে, একজন মুসলিম হিসেবে—এই অনুভূতিটাই আমার কাছে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।

সকলকে ধন্যবাদ অনুচ্ছেদ টি পড়ার জন্য।

1000038736.webp


Support @heroism Initiative by Delegating your Steem Power

250 SP500 SP1000 SP2000 SP5000 SP

Heroism_3rd.png

VOTE @bangla.witness as witness


witness_vote.png

OR

SET @rme as your proxy

witness_proxy_vote.png

Sort:  

This post has been upvoted by @italygame witness curation trail


If you like our work and want to support us, please consider to approve our witness




CLICK HERE 👇

Come and visit Italy Community



Coin Marketplace

STEEM 0.05
TRX 0.29
JST 0.045
BTC 66182.50
ETH 1914.60
USDT 1.00
SBD 0.39