রহস্যের হাতছানি!

আমি সার্থক চ্যাটার্জী, বয়স ২৯, পেশায় কলকাতার নামকরা আইটি সেক্টরে কর্মরত।
বর্তমানে নিজের বাড়ি শিলিগুড়ি এসেছি, এখন ওয়ার্ক ফ্রম হোম এর কারণে অফিস বাড়ি বসেই কাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
তাই কোম্পানির অনুমতি নিয়ে বাড়িতে এসেছি, যদিও পেশায় আমি একজন চাকুরীজীবী কিন্তু সাহিত্যের প্রতি অগাধ টান আছে, পুজো পত্রিকায় ছোট খাটো গল্পো আমি লিখি।
অনেকের সাথেই আমাদের দেখা হয় কিন্তু সবাই কিন্তু অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেতে পারে না। আজ আপনাদের সাথে তেমনই এক রহস্যময়ী রমণীর কাহিনী তুলে ধরবো বলে লিখতে বসেছি।
একজন মানুষের মধ্যের প্রতিভা এবং বিচক্ষণতা সম্পর্কে আমার ধারণা একটি বদ্ধ পরিসরের মধ্যে ছিল, কিন্তু মানুষটির সঙ্গে পরিচয় এবং তার সম্পর্কে জানবার সুযোগ হবার পরে সেটি আমূল বদলে যায়।

পরশু মা বাবার ৩০তম বিবাহ বার্ষিকী, তাই ছোট বোন এসেছে শ্বশুর বাড়ি থেকে। হিলকার্ট রোড এর একটি প্রসিদ্ধ কেক এর দোকানে বোনকে সাথে নিয়ে সেই কেক এর অর্ডার দিতে এসেছি। এখন সকাল সাড়ে এগারোটা বাজে, সকলের টিফিন করে বোনকে নিয়ে চলে এসেছি কেক এর অর্ডার দিতে।
বিভিন্ন কেক দেখার মাঝে, হঠাৎ পাশ থেকে একটি কণ্ঠ ভেসে আসলো না না বললাম তো আজ রাতেই কেকটা লাগবে এবং ঠিকানাটা স্পষ্ট মনে আছে স্বামীজি সরণী, হাকিম পাড়া।
কণ্ঠের আকর্ষণে পাশে তাকিয়ে দেখি শাড়ি পরিহিতা একজন আমার থেকে একটু তফাতে দাড়িয়ে কাউন্টারে দাড়িয়ে থাকা মালিক এর সাথে কথা বলছে।

সাধারণত, শিলিগুড়ি শহরে নেপালিদের আধিক্য বেশি দেখা যায় এবং বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এখানে পশ্চিমী ফ্যাশন এর চল বেশি, তাই এই মহিলার পরিধান তাকে যেনো সবার থেকে আলাদা করে রেখেছে।
চোখদুটো এতই গভীর পড়া খুব মুশকিল, গায়ের রং কাচা হলুদ এর মত, তাকে সুন্দরী বললে কম বলা হবে, একমাথা চুল বেনুনি করে পিঠে ফেলা। কপালে ছোট একটি টিপ,গোলাপী শাড়ি এবং সাদা ব্লাউজ এ যেনো দোকানটা আলো করে রেখেছে।
কেমন যেনো ঘোরের মধ্যে চলে গেছিলাম, পিছন থেকে বোন বলে উঠলো কি ব্যাপার সায়ন্তনী দি তুমি এখানে? প্রত্যুত্তরে ভেসে এলো আজ আমার দিদির জন্মদিন তাই তাঁর পছন্দের কেক অর্ডার দিতে এসেছি।
আর তুমি কি করছো এখানে? আমার বোন জানালো আমাদের আসার কারণ, এতক্ষণে আমার পরিচয় পর্ব এলো, আমার বোন আমাকে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বললো আমার দাদা সার্থক চ্যাটার্জী,কলকাতার আইটি সেক্টরে কর্মরত।
তোমাকে সেই থেকে হা করে দেখছিল, কথাটা শুনে আমি এমন বিপদে পড়ে গেলাম, সেটা বুঝেই মেয়েটি বুদ্ধি করে ব্যাপারটা ম্যানেজ করলো, না আসলে আমি একটু উঁচু গলায় কথা বলছিলাম তাই হয়তো ওনার চোখ গেছে আমার দিকে!
আমি নিরব শ্রোতা এবং দর্শক, এটাও ভাল লাগলো কত সহজে একটা কঠিন মুহূর্তকে সহজ করে দেবার ক্ষমতা রাখে মেয়েটি। যাই হোক, কথা শেষে বেরিয়ে যাবার আগে আমি বললাম পরশু আমার মা বাবার ৩০ তম বিবাহবার্ষিকী আপনি এলে ভালো লাগবে।
আমরা প্রধান নগরে থাকি, আপনি তো হাকিম পাড়ায় থাকেন, বেশি দূরত্ব নয়, কথাটা বলেই আবার লজ্জায় পড়লাম;
উনি হয়তো ভাবছেন আড়ি পেতে ওনার সব কথা দোকানে দাড়িয়ে শুনছিলাম!
এবার নিজের কথা নিজেকেই সামলাতে হলো, বললাম আপনি আসলে আপনার ঠিকানাটা একটু উঁচু গলায় বলছিলেন তাই আর কি!
এই প্রথম দেখলাম চোখে ও হাসা যায়! খুবই বিনম্র ভাবে জানালেন ওনার দিদির কি একটা কাজ আছে ওইদিন, কাজেই আসাটা সম্ভম হবে না।
এই বলে নমস্কার জানিয়ে দোকান থেকে বেরিয়ে গেলেন। আমিও সেই দিকেই তাকিয়ে আছি দেখে আমার বোন পিছন থেকে এমন একটা চিমটি কাটলো যে একমুহুর্তের মধ্যে সব ঘোর কেটে গেলো।
বললাম, বিয়ে হয়ে গেছে এইবার তো স্বভাবটা একটু পাল্টা, নইলে তো শ্বশুরবাড়ি থেকে বিদায় করে দেবে।
উত্তরে বোন বললো, কি করবো বল, কেক কিনতে এসে সেই থেকে যেভাবে সায়ন্তনী দিকে হা করে গিলছিলি, ওই জন্যই তো তোদের পরিচয় করে দিলাম।
মনে মনে খুশী হলাম কিন্তু বোনকে সেটা বুঝতে না দিয়ে।
শিলিগুড়ি শহরে রিক্সার আধিক্য বেশি, কলকাতার মত যানজট নেই বটে তবে দিন দিন এখানেও মানুষের আধিক্য বাড়ছে, সাথে টুরিস্ট দের বাড়তি চাপ।
![]() | ![]() |
|---|
কেক এর অর্ডার দিয়ে একটা রিক্সা ধরে বাড়ির উদ্দেশে রওনা হলাম। কিন্তূ সমস্ত রাস্তাটাই
চোখের সামনে কেবমাত্র সায়ন্তনীর কণ্ঠ এবং চোখের হাসিটা ভেসে আসছিলো। চোখের মধ্যে যেমন দৃঢ়তা, তেমনি অজানা আকর্ষন, কথায় যেমন বলিষ্ঠতা তেমনই মাধুর্যতা।
পাশ থেকে বোন কি যে বলছে কিছুই মাথায় ঢুকছিল না, বাড়ি এসে নিজের ঘরে বসে কেবল সায়ন্তনীর খেয়ালে ডুবে ছিলাম;
প্রথম দেখাতেই মনে হয়েছিল, কিছু একটা মেয়েটির মধ্যে রয়েছে যেটা সাধারণত সবার মধ্যে দেখা যায় না।
চাকরির সুবাদে একসাথে ছেলে মেয়ে নির্বিশেষে এক ছাদের নিচে কাজ করে চলেছি, কিন্তু কখনো কারোর মধ্যে এমন কিছু দেখিনি যেটা তার সম্পর্কে ভাবতে আমাকে কখনো বাধ্য করেছে।
কারণটা সেইদিন বুঝতে না পারলেও অনেক পরে বুঝতে পেরেছিলাম। সেখান থেকেই তাকে নিয়ে আমার এই লেখার সূত্রপাত।

অনেকক্ষণ ভেবে মনে হলো, উত্তরটা বাড়িতেই আছে, আমার বোনের সাথে যখন পরিচয় আছে তখন ওর কাছ থেকেই তথ্য উদ্ধার করতে হবে।
কিন্তু মুশকিল হলো ও বড্ডো বাঁচাল, যেমনি কিছু জিজ্ঞাসা করবো; অমনি বাড়িতে শোরগোল ফেলে দেবে। এমনিতেই বাড়ি থেকে বিয়ের জন্য চাপাচাপি শুরু হয়ে গেছে।
ধুর, বিয়ের পরে মানুষ যেনো কেমন আগল ছাড়া হয়ে যায়, মুখে কিছুই বাঁধে না।
আমার অফিসও দেখেছি, বিয়ের আগে যে মেয়েগুলো মুখ থেকে র কাটত না, তারাই বিয়ের পর কে সব আলোচনা করতো, তাও আবার আশেপাশের লোকজন দের পরওয়া না করে।
সে তাদের বেডরুমের খবর হোক, বা মধু চন্দ্রিমার গল্পো। আমি আধুনিক কিন্তু শালীনতার মোড়কে, আমার কাছে কর্মস্থান এবং পারিবারিক স্থানের মধ্যে একটি সীমারেখা তান আছে।
ভাবতে ভাবতে কত সময় পার করে ফেলেছি, মা ঘরে ঢুকে বললো, কত বেলা হয়েছে খেয়াল আছে? স্নান ধান করবি না নাকি।
ওইদিকে তোর বোন তোর সাথে খাবে বলে বসে আছে, আমার খাওয়া বাকি; শুধু তোর বাবার খাওয়া হয়ে গেছে।
তাকিয়ে দেখি বেলা আড়াইটা বাজে, আমি বললাম এই তো এক্ষুনি করে আসছি মা। বলেই স্নান এর উদ্দেশ্যে বাথরুম এর দিকে যাচ্ছি, অমনি আবার বোনের আওয়াজ, কি রে দাদা কি এমন ভাবছিলে যে, সময় জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছো।
আমি বললাম একটা লেখার কথা ভাবছিলাম, বলেই না দাড়িয়ে সোজা বাথরুমে ঢুকে গেলাম।
শুধু আড় চোখে দেখলাম, বোন মুচকে হাসছে; স্নান করতে করতে ভাবছি, কি করে কথাটা বোনের কাছে উপস্থাপন করা যায়!
.....চলবে!



