এক্ টুকরো ইতিহাস!

in Incredible India19 hours ago
1000085851.jpg
রাইটার্স বিল্ডিং

কল্লোলিনী কলকাতা! হ্যাঁ! এই নামেই পরিচিত আমার এই শহর।

তবে, আজকে আমার এই লেখার মাঝে যে ছবিগুলো তুলে ধরেছি, তাদের সাধারণ ছবির আওতাভুক্ত মোটেই করা যাবে না!

বিস্মিত হবেন না! এই যে ছবিগুলো আপনাদের মাঝে তুলে ধরেছি, এর অন্তরালে রয়েছে পরাধীন ভারতের ইতিহাস!

অনেক ঘটনার সাক্ষী আমার এই শহর, কারণ পরাধীন ভারতের সময় ইংরেজ দের ঘাঁটি ছিল এই কলকাতা শহর।

শুধু শাসনের সুবিধার্থে নয়, বরং ব্যবসায়িক সুবিধার্থে এই শহরকে তারা বেছে নিয়ে তৈরি করেছিল ব্রিজ, ইমারত, রেলপথ আর অনেক কিছু!

1000085843.jpg
লাল দিঘি

এই সবকিছুর মধ্যে থেকে আজকে যে ছবিগুলো তুলে ধরেছি, সেগুলো ডালহৌসিতে লাল দীঘির উত্তরে অবস্থিত রাইটার্স বিল্ডিং এর
বর্তমানে বি.বি.ডি. বাগ নামে পরিচিত।

এবার খানিক ইতিহাসের পাতা উল্টে এই জায়গা তথা এই বিল্ডিং টির ঐতিহাসিক গুরুত্ব নিয়ে আলোচনার প্রয়াস করা যাক।

1000085849.jpg

ইতিহাস জানতে পড়ুন, কিভাবে অবজ্ঞায় একটি বিল্ডিং এর নামকরণ করা হয়েছিল, লেখার এই অংশে সেই বিষয়টি উল্লেখ করছি।

সময়টা অষ্টাদশ শতক, কলকাতায় তখন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রাজত্ব, এবং লেখায় পূর্বেই উল্লিখিত বাণিজ্যিক সুবিধার জন্য এই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এই বিল্ডিং তৈরি করা হয় ১৭৭৭ সালে থমাস লিয়ন এর নেতৃত্বে।

কারণ কি ছিল এই নির্মাণের পিছনে?

সেই সময় বাণিজ্য তথা কর এবং প্রশাসনিক কাগজপত্রের হিসেব নিকেষ রাখবার জন্য একদল ক্লার্ক অর্থাৎ বাংলায় বললে কেরানিদের নিয়োগ করেন ইংরেজ সরকার।
এখনকার মতো তখন তো কম্পিউটার ছিল না, কাজেই হাতে লিখে সমস্ত হিসেব রাখতে হতো।

সেই লেখার হাত ধরে এই কর্মীদের নামকরণ করা হয় রাইটার, আর যেহেতু তারা কর্মরত ছিল এই বিল্ডিং এ কাজেই, বিল্ডিং এর নামকরণ করা হলো

রাইটার্স বিল্ডিং।

1000085847.jpg

1000085859.jpg1000085853.jpg

1000085861.jpg

পরবর্তীতে এই কর্মচারীদের থাকার ব্যবস্থা হিসেবে আনুমানিক ১৯ টি আবাসন তৈরির সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, সেই সময় দায়িত্বপ্রাপ্ত ইংরেজ সরকার।

সময়ের হাত ধরে পরবর্তীতে এই বিল্ডিং ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে রূপান্তরিত হয়, যেখানে, হিন্দি , বাংলা তথা ফরাসি ভাষার মত ভিন্ন ভাষা শেখানো হতো নবীন রাইটার্স দের, যাতে কর আদায়, এবং বাণিজ্যিক কাজে স্থানীয় মানুষদের সাথে সহজেই এই রাইটার্সরা যোগাযোগ স্থাপন করতে পারে।

ইতিপূর্বে একাধিক লেখায় উল্লেখিত কলকাতা এবং সেই সময়ের ক্যালকাটা ছিল অবিভক্ত ভারতের রাজধানী।

এখানে বিষয়টির পুনরাবৃত্তি করলাম কারণ আজকের লেখায় যে বিল্ডিং সম্পর্কে তথ্য দেবার প্রয়াস করছি, একটি সময় ‘রাইটার্স বিল্ডিং’ রূপান্তরিত হয় ইংরেজদের সচিবালয়ে।

নব সংস্কারের হাত ধরে তৈরি করা হয় এই ইংরেজ সচিবালয়।
আমার কাছে এই বিল্ডিংয়ের একটি বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে, এবার সেই বিষয়টি তুলে ধরবার চেষ্টা করছি।

যেহেতু পরবর্তীতে এই বিল্ডিং ইংরেজ সচিবালয় হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছিল, কাজেই এই বিল্ডিং তথা এই বি.বি.ডি. বাগ এর মাটি হয়ে ওঠে স্বাধীনতা সংগ্রামী তথা সংগ্রামের মুল কেন্দ্রবিন্দু!

1000085855.jpg

আজকের লেখায় এই যে বি.বি.ডি. বাগ নামটি উল্লেখ করছি, এই অক্ষর গুলোর মধ্যে রয়েছে তিনজন স্বাধীনতা সংগ্রামী বিনয় বসু, বাদল গুপ্ত এবং দীনেশ গুপ্তের নাম।

সালটা ১৯৩০ তখনকার কারাগার মহাপরিদর্শক দণ্ডদপ্রতাপ লেফটেন্যান্ট কর্নেল এন.এস. সিম্পসন কে হত্যা করেন উপরিউক্ত তিন স্বাধীনতা সংগ্রামী।

স্বাধীনতা অর্জনের পর এই তিনজন দুঃসাহসিক স্বাধীনতা সংগ্রামীদের নামানুসারে এবং তাদের সম্মানার্থে পার্শ্ববর্তী ডালহৌসি স্কোয়ার এলাকাটির নামকরণ করা হয় ‘বি.বি.ডি. বাগ’।

সময় আরো একবার পরিবর্তিত হয়, ভারত পরাধীনতার গ্লানিমুক্ত হয় ১৯৪৭ সালে এবং এরপর থেকে এই রাইটার্স বিল্ডিং কে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের প্রধান প্রশাসনিক সদর দপ্তর (সচিবালয়) হিসেবে ব্যবহৃত হতো।

1000085857.jpg

1000085845.jpg
1000085841.jpg

অনেকেই জানেন পশ্চিমবঙ্গে সদ্য নির্বাচন হবার পরে নতুন সরকার গঠিত হয়েছে, আগের সরকার অন্যত্র নিজেদের দপ্তর স্থানান্তরিত করলেও, এই নব নির্মিত সরকার পুনরায় এই রাইটার্স বিল্ডিংকেই তাদের সচিবালয় হিসেবে বেছে নিয়েছেন।

সব মিলিয়ে আজকে আপনাদের মাঝে এই বিল্ডিং এর নির্মাণ থেকে বর্তমান অবস্থান তুলে ধরবার একটি ক্ষুদ্র প্রয়াস করলাম এক্ টুকরো ইতিহাসের হাত ধরে।

শহরে বসবাস করলেই তার প্রতি দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না!
যে শহর থেকে আমাদের একাধিক প্রত্যাশা সেখানের ইতিহাস অজানা থাকলে শহরের বাসিন্দা তথা নাগরিক হিসেবে এবং ইতিহাসে যারা নিজেদের আত্ম বলিদান দিয়েছিলেন, তাদের প্রতি অন্যায় করা হয় বলে আমি বিশ্বাস করি।

আমি অন্ততঃপক্ষে সেই তালিকাভুক্ত হতে নারাজ! বাকিদের ভাবনা নিয়ে আমার বিশেষ মাথা ব্যথা নেই, কারণ সকলের শিক্ষার পরিবেশ ভিন্ন সাথে চিন্তাধারাও!

ভালবাসা সেটাই যেখানে জানার এবং শেখার কৌতূহল থাকে, আমার তো তাই মনে হয়, আর আপনাদের?

1000010907.gif

1000010906.gif

Sort:  
Loading...