“সারা সেমিস্টার ঘুম, পরীক্ষার আগে হঠাৎ সাধু!—শিক্ষার্থীদের রহস্যময় রূপান্তরের গল্প”
আসসালামু-আলাইকুম। আদাব - নমস্কার। মাতৃভাষা বাংলা ব্লগিং এর একমাত্র কমিউনিটি আমার বাংলা ব্লগ এর ভারতীয় এবং বাংলাদেশী সদস্যগণ, আশা করি সবাই ভাল আছেন।
বছরের অন্য সময় যদি কোনো শিক্ষার্থীকে বলা হয়, “পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ো”, “সময়মতো ঘুমাও”, “মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করো”—তাহলে হয়তো সে বলবে, “আচ্ছা কাল থেকে শুরু করবো।” কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, পরীক্ষার সময় যতই কাছে আসে, ততই মানুষের ভেতরে যেন এক অদ্ভুত পরিবর্তন দেখা যায়। যে মানুষটা সারাবছর বইয়ের দিকে তাকালেই ঘুম পেত, সে হঠাৎ রাত জেগে পড়তে শুরু করে। যে বন্ধু ক্লাসে সবসময় হাসি-ঠাট্টা করত, সে হঠাৎ সবাইকে “ভাই দোয়া কইরো” বলা শুরু করে। আর সবচেয়ে বড় পরিবর্তন—মানুষ হঠাৎ করেই ধর্মভীরু আর অতিভদ্র হয়ে যায়!বিষয়টা মজার হলেও বাস্তবতা হলো, পরীক্ষার ভয় মানুষের ভেতরের লুকানো সংস্করণ বের করে আনে। হঠাৎ করে মনে হয়, শুধু পড়াশোনা দিয়ে হবে না—উপরওয়ালার সাহায্যও দরকার! তাই দেখা যায়, যারা সারা বছর হয়তো ধর্মীয় কাজকর্মে খুব একটা নিয়মিত না, তারাও পরীক্ষার সময় হঠাৎ মনোযোগী হয়ে যায়। কেউ বেশি বেশি প্রার্থনা করে, কেউ মানত করে, কেউ আবার বন্ধুদের বলে, “আমার জন্য একটু দোয়া কইরো।” যেন পরীক্ষার হলটা একটা যুদ্ধক্ষেত্র আর দোয়া হলো শেষ অস্ত্র!পরীক্ষার আগে অতিভদ্র হয়ে যাওয়ার ঘটনাটাও কম মজার না। সারা বছর যে ছেলে বা মেয়ে বাবা-মায়ের কথা শুনতে চায় না, সে পরীক্ষার এক সপ্তাহ আগে থেকে এমন ব্যবহার শুরু করে যেন পৃথিবীর সবচেয়ে ভদ্র সন্তান সে-ই। মা এক গ্লাস পানি আনতে বললে আগে হয়তো উত্তর আসত, “এখন পারবো না।” কিন্তু পরীক্ষার আগে সেই একই মানুষ বলে, “আচ্ছা মা, এখনই এনে দিচ্ছি।” কারণ মনের ভেতরে একটা ভয় কাজ করে—যদি মা-বাবার মন খারাপ হয়, যদি তাদের দোয়া না থাকে, তাহলে পরীক্ষাও খারাপ হতে পারে!শুধু পরিবার না, শিক্ষকদের প্রতিও আচরণ বদলে যায়। যেই স্যারকে দেখে সারা বছর রাস্তা বদলে ফেলা হতো, পরীক্ষার আগে সেই স্যারকে দেখলে মনে হয় পৃথিবীর সবচেয়ে সম্মানিত মানুষ। হঠাৎ করে সবাই সালাম দেওয়া শুরু করে, নম্র কণ্ঠে কথা বলে, আর মনে মনে ভাবে—“স্যার যেন একটু সহজ প্রশ্ন দেন!” যেন ভদ্রতা দিয়েই নম্বর বাড়ানোর একটা গোপন চেষ্টা চলছে।বন্ধুদের মাঝেও তখন অন্যরকম পরিবেশ তৈরি হয়। যে বন্ধু সারা বছর নোট শেয়ার করতো না, সেও হঠাৎ ভালো মানুষ সাজার চেষ্টা করে। কেউ কাউকে বলে, “দোস্ত, কিছু লাগলে বলিস।” আবার কিছু মানুষ এমনভাবে পড়াশোনা নিয়ে টেনশন দেখায়, যেন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সংকট তার জীবনেই চলছে। অথচ পরীক্ষার আগের মাস পর্যন্ত তাকে খুঁজে পাওয়া যেত সিনেমা, আড্ডা আর মোবাইল স্ক্রলে!আসলে মানুষের এই পরিবর্তনের পেছনে একটা বড় কারণ হলো ভয়। পরীক্ষার ভয় মানুষকে এমন কিছু করায়, যা সে স্বাভাবিক সময়ে করত না। ভয় মানুষকে দায়িত্বশীল বানায়, বিনয়ী বানায়, এমনকি ধর্মীয় দিকেও টেনে আনে। কারণ মানুষ যখন চাপের মধ্যে পড়ে, তখন সে স্বাভাবিকভাবেই আশ্রয় খোঁজে—কখনো পরিবারের কাছে, কখনো বন্ধুদের কাছে, কখনো নিজের বিশ্বাসের জায়গায়।তবে এখানে একটা মজার প্রশ্নও আছে—এই পরিবর্তন যদি পরীক্ষার সময় সম্ভব হয়, তাহলে সারা বছর কেন হয় না? কেন আমরা দায়িত্বশীল, ভদ্র বা নিয়মিত হওয়ার বিষয়টা শুধু ভয় আসলে মনে করি? হয়তো কারণ মানুষ সহজে বদলায় না, যতক্ষণ না সে চাপ অনুভব করে। পরীক্ষা তখন সেই চাপের জায়গা হয়ে দাঁড়ায়, যেটা মানুষকে কিছু সময়ের জন্য হলেও বদলে দেয়।সবচেয়ে হাসির ব্যাপার হলো, পরীক্ষা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই এই “সাধু ভার্সন” ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে থাকে। যে মানুষটা পরীক্ষার আগে প্রতিদিন প্রার্থনা করত, ভদ্রভাবে কথা বলত, সবার সাহায্য করত—পরীক্ষা শেষ হওয়ার কয়েকদিন পর তাকে আবার আগের রূপে দেখা যায়। মনে হয় যেন পরীক্ষা নামের একটা বিশেষ অনুষ্ঠান শেষ, তাই ভালো মানুষ হওয়ার ছুটিও শেষ!তবুও এই পুরো ব্যাপারটার মধ্যে একটা সুন্দর দিক আছে। পরীক্ষার আগে মানুষের এই পরিবর্তন দেখায় যে, চাপের সময় মানুষ নিজের ভালো সংস্করণ বের করে আনতে পারে। হয়তো ভয় তাকে সেটা করতে বাধ্য করে, কিন্তু তবুও সে চেষ্টা করে ভালো হতে, বিনয়ী হতে, মনোযোগী হতে। যদি এই অভ্যাসগুলোর কিছু অংশও সারা বছর ধরে রাখা যেত, তাহলে হয়তো শুধু পরীক্ষার ফলই না, জীবনের অনেক কিছুই আরও সুন্দর হতো।তাই “পরীক্ষার আগে সবাই কেন হঠাৎ ধর্মভীরু আর অতিভদ্র হয়ে যায়?”—এর উত্তর খুব কঠিন কিছু না। কারণ পরীক্ষার সময় মানুষ বুঝতে পারে, শুধু আত্মবিশ্বাস না—দোয়া, ভদ্রতা, ভালো সম্পর্ক আর মনোযোগ—সবকিছুরই একটা মূল্য আছে। আর সত্যি বলতে, পরীক্ষা মানুষের ভেতরের লুকানো নাটুকে, ভীতু, ভদ্র আর ধর্মভীরু মানুষটাকে কয়েকদিনের জন্য বাইরে নিয়ে আসে!
শেষমেশ একটা কথা বলতেই হয়—পরীক্ষার আগে যারা হঠাৎ ভালো মানুষ হয়ে যাও, তোমাদের দোষ নেই। কারণ এই পৃথিবীতে “পরীক্ষা” নামক জিনিসটাই এমন—এটা সবচেয়ে অলস মানুষকেও কয়েক দিনের জন্য সাধু বানিয়ে দেয়!
সকলকে ধন্যবাদ অনুচ্ছেদ টি পড়ার জন্য।


Support @heroism Initiative by Delegating your Steem Power
| 250 SP | 500 SP | 1000 SP | 2000 SP | 5000 SP |
VOTE @bangla.witness as witness

OR

