শৈশবের বর্ষা : "বিলের হাঁটু পানিতে গোসল করার দিনগুলো"
বর্ষাকাল এলেই আমার শৈশবের অনেক মজার মুহূর্ত একের পর এক চোখের সামনে ভেসে ওঠে। এখনো মনে পড়ে, আমাদের গ্রামের পাশেই ছিল এক বিশাল বিল। বর্ষা এলেই সেই বিল ভরে যেত হাঁটু পর্যন্ত স্বচ্ছ পানিতে। আর তখনই আমাদের শুরু হতো রাজত্ব জলজ রাজত্ব।চলুন তাহলে আজকে আপনাদের সাথে আমার শৈশবের বর্ষার দিনে বিলের পানিতে গোসল করার গল্প বলি..
স্কুলে তখন যেতাম না বৃষ্টির কারণে। পড়ালেখাকে ছুটি দিয়েই আমরা ছুটতাম বিলে। আমি, আমার বন্ধু আকাশ, সুমন, জুয়েল আর ছোট ভাই রাকিব এই ছিল আমাদের টিম। বাড়ির পেছনের ফসলি জমি পার হয়ে পাঁকের পথ ধরে হেঁটে হেঁটে পৌঁছে যেতাম বিলে। কে কার আগে নামবে পানিতে এই নিয়েও চলতো হালকা মারামারি।বিলের পানি তখন একদম ঠান্ডা, কোমল। হাঁটু পানিতে দাঁড়িয়ে থাকলেই মনে হতো পানিতে নয়, যেন কোনো স্বপ্নের মধ্যে হাঁটছি। আমরা সবাই একসাথে দৌড় দিতাম পানির উপর দিয়ে, একেক জায়গায় পানি ছিটিয়ে দিতাম আরেকজনের গায়ে। মাঝে মাঝে কেউ কেউ পানিতে লাফ দিয়ে ডুব দিত, আবার কেউ কেউ ঠাণ্ডা পানিতে শুয়ে থেকেও আনন্দ নিত। হাসাহাসি, পানি ছিটানো, কাদা মাখা এসব ছিলো বর্ষার নিত্যদিনের খেলা।আমরা মাঝে মাঝে ছোট ছোট মাছও ধরতাম। কেউ কেউ জামা খুলে সেটা দিয়ে মাছ ধরার চেষ্টা করত। কেউ আবার পাতা কুড়িয়ে ছোট নৌকা বানাত আর জলে ভাসিয়ে দিত। একটা সময় এমনও হতো, সবাই নৌকা বানিয়ে রেস করাতাম কার নৌকা সবচেয়ে দূর যাবে তা নিয়েও বাজি ধরা লাগত।
মাঝে মাঝে বিলে সাদা পদ্ম ফুটতো, আর সেই পদ্ম কুড়িয়ে এনে মায়ের জন্য নিয়ে যেতাম। মা হাসিমুখে বলতো, “আমার ছেলেটা কত আদর করে ফুল এনেছে।” সেই প্রশংসার আনন্দটাই ছিলো আমাদের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।কখনো হঠাৎ হঠাৎ বৃষ্টিও নামত। তখন সবাই মিলে বৃষ্টির ভেতরেই গোসল করতাম। মাথার উপর থেকে ঝরতে থাকা ফোঁটাগুলোর নিচে দাঁড়িয়ে চোখ বন্ধ করে রাখতাম। সেই শব্দ, সেই অনুভূতি আজও কানে ভাসে, মনে পড়ে।বিলপারে এক বুড়ো তালগাছ ছিল। সেখানে বসে আমরা বিশ্রাম নিতাম। কখনো ঠাকুরমার ঝুলি থেকে শোনা গল্প মনে পড়ে যেত, কেউ একজন গল্প বলা শুরু করত ভূতের, রাজপুত্রের, রাজকন্যার। সেই গল্প শোনার মধ্যে একধরনের জাদু ছিল।দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতো, তখন বাড়ি থেকে মা বা দাদী চিৎকার করে ডাকতো "এই ফয়সাল! আকাশ! এতক্ষণ কোথায় রে? ঠাণ্ডা লেগে যাবে তো!" তখনই বুঝতাম, অনেকক্ষণ পানিতে থেকে গা ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। কিন্তু সেই ভিজে জামা-কাপড়ে কাঁপতে কাঁপতে বাড়ি ফেরা, তারপর গরম ভাত-ভাজি খাওয়া এই আনন্দই তো ছিলো বর্ষার স্বাদ।
আজ যখন শহরের ব্যস্ত জীবনে দিন কাটাই, তখন এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোর মায়া আমাকে ঘিরে ধরে। এখন আর কেউ ডেকে বলে না, “চল রে বিলে যাই।” এখন আর বৃষ্টিতে ভিজে গোসল করার মতো সময়ও নেই। হাঁটু পানি, মাছ ধরা, পদ্ম কুড়ানো সবই এখন স্মৃতি হয়ে গেছে।তবে মাঝে মাঝে চোখ বন্ধ করে সেই দিনগুলোর কথা ভাবলে মনে হয়, আমি এখনো সেই বিলে দাঁড়িয়ে আছি। পাশে আমার বন্ধুরা, মাথার ওপর বৃষ্টি ঝরছে, আর আমি হাঁটু পানিতে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছি মুগ্ধ হয়ে, ভালোবেসে।
শৈশব মানেই এমন কিছু অমূল্য স্মৃতি, যেগুলো সারাজীবনের সঙ্গী হয়ে থাকে। বিলের হাঁটু পানিতে গোসল করা শুধু একটা খেলা নয় ছিল, বরং তা ছিল আমাদের জীবনের এক টুকরো আনন্দ, এক টুকরো স্বর্গ।আজও কোনো এক বর্ষার দিনে বৃষ্টির শব্দ শুনলে, মনটা কেমন করে যেন ডাকে“চল রে, আবার একবার বিলে নামি...”
আজ এখানেই শেষ করছি। অন্য কোন একদিন ভিন্ন ধরনের কনটেন্ট নিয়ে আপনাদের মাঝে হাজির হব। ততক্ষন পর্যন্ত আপনারা সবাই ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন, আল্লাহ হাফেজ।





X-Promotion
Upvoted! Thank you for supporting witness @jswit.
Thank you for sharing on steem! I'm witness fuli, and I've given you a free upvote. If you'd like to support me, please consider voting at https://steemitwallet.com/~witnesses 🌟
Daily Tasks
Comments Link:-
https://x.com/mohamad786FA/status/1945556208502620428?t=O576dg7B26FU637vn5jhAQ&s=19
https://x.com/mohamad786FA/status/1945556491240698304?t=OdanuvsmFLaULEyqtcR10Q&s=19
https://x.com/mohamad786FA/status/1945556684782670184?t=l3rfDV5XTETLNX16f1uqYg&s=19
Ss
🎉 Congratulations!
Your post has been manually upvoted by the SteemX Team! 🚀
SteemX is a modern, user-friendly and powerful platform built for the Steem ecosystem.
🔗 Visit us: www.steemx.org
✅ Support our work — Vote for our witness: bountyking5