বিয়ের পর মেয়ের বাবা-মা যদি মেয়ের পাশে না থাকে, ইসলাম কী বলে?

in সাহিত্য ক্যানভাস2 hours ago
বিয়ের পর মেয়ের বাবা-মা যদি মেয়ের পাশে না থাকে

ChatGPT Image Aug 20, 2026, 03_13_03 PM.png


কিছু কষ্ট আছে, যেগুলো কাউকে বলা যায় না। মুখে হাসি রেখে অনেক কিছু সহ্য করতে হয়। বিশেষ করে যখন বিষয়টা নিজের স্ত্রী, শ্বশুরবাড়ি আর নিজের পরিবারের মধ্যে এসে দাঁড়ায়, তখন একজন স্বামী চাইলেও সব কথা বলতে পারে না। কারণ সে শুধু নিজের কথা ভাবে না, সে তার স্ত্রীকে ভালোবাসে, তাদের অনাগত সন্তানকে ভালোবাসে, আর চায় না তার একটি কথার কারণে সংসারে আরও অশান্তি তৈরি হোক।

কখনো কখনো বিয়ের পর একজন মেয়ে নিজের বাবা-মায়ের কাছ থেকেই এমন দূরত্ব পায়, যা তার জন্য খুব কষ্টের হয়ে দাঁড়ায়। বাবা-মা মেয়ের সংসারের খোঁজ নেন না, মেয়েটা কেমন আছে জানতে চান না, স্বামী কেমন আছে সেটাও জানতে চান না। অথচ মেয়েটা মনে মনে সবসময় আশা করে, “আমার বাবা-মা অন্তত একবার তো আমার খোঁজ নেবে। আর যখন সেই মেয়েটি নিজেই মা হতে চলেছে, তখন এই অভাবটা আরও বেশি অনুভূত হয়।

একজন মেয়ের কাছে নিজের মা-বাবার ভালোবাসা পৃথিবীর অনেক বড় সম্পদ। তাই যখন সে দেখে, তার জীবনের এত গুরুত্বপূর্ণ সময়েও বাবা-মায়ের কাছ থেকে তেমন খোঁজ নেই, তখন তার ভেতরে যে কষ্ট তৈরি হয়, সেটা বাইরে থেকে বোঝা কঠিন। একজন স্বামী তখন কী করবে? আমি মনে করি, প্রথম কাজ হলো, স্ত্রীর কষ্টকে ছোট না করা। তাকে বলা উচিত নয়, “তোমার বাবা-মা তো এমনই, তাদের কথা ভুলে যাও।”

বরং বলা উচিত, তুমি কষ্ট পেয়ো না। তুমি তাদের মেয়ে হিসেবে তোমার ভালোবাসা ও দায়িত্বটা রাখো। তারা তোমার প্রতি কেমন আচরণ করবে, তার হিসাব আল্লাহ নেবেন। তুমি তোমার দিক থেকে ভালো থেকো। কারণ বাবা-মা যদি কোনো ভুলও করেন, সেই ভুলের কারণে একজন মেয়েকে তার বাবা-মাকে ঘৃণা করতে শেখানো ইসলামের পথ নয়। কুরআন বাবা-মায়ের সঙ্গে সদাচরণের ব্যাপারে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। একই সঙ্গে ইসলাম অন্যায়ের পক্ষেও দাঁড়াতে বলে না।

ChatGPT Image Aug 20, 2026, 03_27_54 PM.png

অর্থাৎ বাবা-মাকে সম্মান করা এক বিষয়, আর তাদের প্রতিটি আচরণকে সঠিক বলে মেনে নেওয়া আরেক বিষয়। আমার নিজের জীবনের ক্ষেত্রেও এমন কিছু পরিস্থিতি এসেছে, যেগুলো অনেক কষ্টের। আমি এবং আমার স্ত্রী, দুজনের পরিবারেই অসুস্থতা ও নানা সমস্যা চলছে। আমার স্ত্রী এখন মাতৃত্বের শেষ দিকের সময়ে, সামনে আমাদের সন্তান আসছে। এমন সময়ে স্বাভাবিকভাবেই একজন মেয়ে তার নিজের বাবা-মায়ের কাছ থেকে একটু খোঁজ, একটু সাহস, একটু ভালোবাসা আশা করে।

কিন্তু যখন সেই খোঁজও আসে না, তখন তার কষ্ট হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। আর একজন স্বামী হিসেবে সেই কষ্ট নিজের চোখের সামনে দেখাটা আরও কঠিন। তার ওপর যদি বারবার স্বামীকে অপমান করা হয়, স্বামীর বাবা-মাকে অপমান করা হয়, বিপদের সময় সহযোগিতা না করে বরং পরিস্থিতি আরও কঠিন করে তোলা হয়, তাহলে একজন মানুষের ভেতরে কষ্ট জমতে থাকে। আমারও কষ্ট হয়।

অনেকবার আমার সম্মান নষ্ট হয়েছে। বিয়ের দিন থেকেই এমন কিছু আচরণ পেয়েছি, যা একজন স্বামী হিসেবে সহজে মেনে নেওয়া কঠিন। তারপরও আমি অনেক কথা চুপ করে গেছি। কেন? কারণ আমি আল্লাহকে ভয় করি। আর তার থেকেও বড় কথা আমি আমার স্ত্রীকে ভালোবাসি। আমি চাই না আমার রাগের কারণে সে তার বাবা-মা আর স্বামীর মাঝখানে আরও বেশি কষ্ট পাক। আমি চাই না আমাদের অনাগত সন্তান পৃথিবীতে আসার আগেই দুই পরিবারের অশান্তির মধ্যে পড়ুক।

তাই অনেক কথা গিলে ফেলেছি। কিন্তু চুপ থাকা মানে এই নয় যে কষ্ট হয় না। কখনো কখনো মানুষ বাইরে থেকে খুব শক্ত থাকে, অথচ ভেতরে ভেতরে অনেক ভেঙে যায়। ইসলাম আমাদের শেখায়, রাগের সময়ও ন্যায় থেকে সরে যাওয়া যাবে না। কারও প্রতি বিরক্তি যেন আমাদের অন্যায় করতে বাধ্য না করে, কুরআনে ন্যায়ের ব্যাপারে এমনই কঠোর নির্দেশ এসেছে।

তাই আমি যদি অন্যায়ের শিকারও হই, আমাকেও অন্যায় করে তার জবাব দেওয়ার অধিকার ইসলাম দেয় না। কেউ আমাকে অপমান করলে আমিও তাকে অপমান করব, এটা সমাধান নয়। কেউ আমার বাবা-মাকে অসম্মান করলে আমিও তার বাবা-মাকে অসম্মান করব, এটাও ইসলামের শিক্ষা নয়। বরং নিজের চরিত্রটা ধরে রাখাই আসল পরীক্ষা। কারণ মানুষ আমাকে কীভাবে আচরণ করল, সেটা আমার হাতে নেই। কিন্তু আমি তার জবাবে কেমন আচরণ করব, সেটা আমার হাতে।

তবে এর অর্থ এই নয় যে অন্যায় সবসময় সহ্য করতেই হবে। সংসারের শান্তি রক্ষা করা যেমন জরুরি, তেমনি নিজের এবং নিজের বাবা-মায়ের সম্মান রক্ষা করাও গুরুত্বপূর্ণ। প্রয়োজনে সীমা তৈরি করা যায়, দূরত্ব রাখা যায়, অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা এড়িয়ে চলা যায়, কিন্তু সেটা যেন প্রতিশোধ বা সম্পর্ক ছিন্ন করার মানসিকতা থেকে না হয়।

কিন্তু একই সঙ্গে এটাও সত্য একজন মানুষকে সম্মান করা, তার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করা, বিপদের সময় অযথা কষ্ট না দেওয়া, এগুলো মানবিকতা ও ইসলামী চরিত্রের অংশ। একজন জামাইকে নিজের ছেলে বানাতেই হবে, এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। কিন্তু অপমান করাও কোনো অধিকার নয়। একজন মেয়ের স্বামীকে ভালোবাসতেই হবে, এমন নয়। কিন্তু অন্যায়ভাবে তার সম্মান নষ্ট করাও ঠিক নয়।

ChatGPT Image Aug 20, 2026, 03_30_58 PM.png

একজন শ্বশুর-শাশুড়ি সব সময় জামাইয়ের পাশে থাকবেন, এমন নিশ্চয়তাও ইসলামে নেই। কিন্তু যদি তারা পারেন, তাহলে বিপদের সময় পাশে দাঁড়ানো, অন্তত খোঁজ নেওয়া, মেয়ের সংসারে শান্তি চাওয়া, এগুলো অত্যন্ত সুন্দর আচরণ। আর একজন স্বামীরও দায়িত্ব হলো তার স্ত্রীকে ভালোভাবে রাখা। কুরআন স্বামীদের স্ত্রীদের সঙ্গে সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছে। রাসুলুল্লাহ বলেছেন, “তোমাদের মধ্যে উত্তম সেই, যে তার পরিবারের কাছে উত্তম।”

তাই আমি চাই, আমার স্ত্রী তার বাবা-মাকে ভালোবাসুক। তাদের জন্য দোয়া করুক। তারা তার খোঁজ না নিলেও সে যেন নিজের অন্তরকে কঠিন না করে। আর আমি তার স্বামী হিসেবে চাই সে যেন কখনো নিজেকে একা মনে না করে।

আমি তাকে বলতে চাই, “তোমার বাবা-মা তোমার জীবনের অংশ। তুমি তাদের ভালোবাসো। তাদের জন্য দোয়া করো। কিন্তু মনে রেখো, তুমি একা নও। আমি আছি। আমাদের সন্তান আছে। আমাদের ছোট্ট সংসার আছে। আমরা আল্লাহর ওপর ভরসা করে সামনে এগিয়ে যাব।”

হয়তো তার বাবা-মা আজ তার কষ্ট পুরোপুরি বুঝতে পারছেন না। হয়তো তারা তার সংসারের খবর নিচ্ছেন না। হয়তো তারা আমাকে পছন্দ করেন না। হয়তো আমার বাবা-মায়ের প্রতিও তাদের আচরণে কষ্ট পাওয়ার মতো অনেক কিছু আছে। তারপরও আমি চাই না আমার স্ত্রী তার বাবা-মাকে ঘৃণা করুক। কারণ ঘৃণা নিয়ে কোনো সংসার সুন্দর হয় না।

আমরা আমাদের সন্তানকে ভালোবাসা, সম্মান আর ক্ষমার শিক্ষা দিতে চাই। তাহলে আমাদের নিজেদের জীবনেও সেই শিক্ষার কিছুটা বাস্তবায়ন করতে হবে। আর একটা বিষয় মনে রাখা দরকার, কোনো মানুষের ভুলের পুরো বোঝা অন্য একজনের ওপর চাপানো যাবে না। কুরআন বলে, কেউ অন্য কারও বোঝা বহন করবে না।

তাই আমার শ্বশুরবাড়ির মানুষ কী করেছে, তার হিসাব তাদের। আমি কী করেছি, তার হিসাব আমার। আমার বাবা-মা কী করেছেন, তার হিসাব তাদের। শেষ পর্যন্ত সবাইকে নিজের আমলের হিসাব নিজেকেই দিতে হবে। আমি শুধু এটুকু চাই, আমার স্ত্রী ভালো থাকুক। আমাদের সন্তান সুস্থভাবে পৃথিবীতে আসুক। দুই পরিবারের মধ্যে যতটা সম্ভব শান্তি থাকুক।

আর যারা আমাদের কষ্ট দিয়েছেন, তাদের জন্যও আমি আল্লাহর কাছে হেদায়েত চাই। কারণ প্রতিশোধ নেওয়া খুব সহজ। ক্ষমা করে নিজের চরিত্র ধরে রাখা অনেক কঠিন। আমি জানি না ভবিষ্যতে সব সম্পর্ক কেমন হবে। জানি না যারা আজ পাশে নেই, তারা একদিন পাশে দাঁড়াবে কি না। কিন্তু আমি জানি, আল্লাহ সব দেখছেন। আমার নীরবতা দেখছেন। আমার স্ত্রীর কষ্ট দেখছেন। আমাদের পরিবারের অসুস্থতার সময় দেখছেন।

যে কথাগুলো আমি কাউকে বলিনি, সেগুলোও তিনি জানেন। তাই মানুষের কাছে নিজের কষ্টের বিচার চাইতে চাই না। আল্লাহর কাছে শুধু চাই, “হে আল্লাহ, আমার স্ত্রীকে শান্তি দিন। আমাদের সন্তানকে নেক ও সুস্থ জীবন দিন। আমাদের দুই পরিবারকে হেদায়েত দিন। আমাদের মধ্যে ভালোবাসা বাড়িয়ে দিন। যারা আমাদের কষ্ট দিয়েছে তাদেরও সঠিক পথ দেখান। আর আমাকে এমন শক্তি দিন, যেন অন্যায়ের জবাবে আমিও অন্যায় না করি।”

কারণ শেষ পর্যন্ত মানুষের দেওয়া সম্মান বা অপমান, কোনোটাই চিরস্থায়ী নয়। চিরস্থায়ী হলো আল্লাহর কাছে আমাদের আমল। আর আমি আমার স্ত্রীকে শুধু এটুকুই বলতে চাই, “তুমি কেঁদো না। তোমার বাবা-মা তোমার খোঁজ নিক বা না নিক, আল্লাহ তোমার খবর রাখেন। তুমি একা নও। আমি আছি, আমাদের সন্তান আছে, আর আমাদের রব আছেন।”

আল্লাহ আমাদের পরিবারগুলোকে হিংসা, অহংকার, ভুল বোঝাবুঝি ও অশান্তি থেকে রক্ষা করুন। স্বামী-স্ত্রীর ভালোবাসা অটুট রাখুন এবং প্রত্যেককে তার হক আদায় করার তাওফিক দিন। আমিন।







photo_2021-06-28_11-13-39.jpg

আমি আল সারজিল ইসলাম সিয়াম। আমি বাঙালি হিসেবে পরিচয় দিতে গর্ববোধ করি। আমি বর্তমানে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের বিএসসি-র ছাত্র। আমি স্বতন্ত্র স্বাধীনতা সমর্থন করি। আমি বই পড়তে এবং কবিতা লিখতে পছন্দ করি। আমি নিজের মতামত প্রকাশ করার এবং অন্যের মতামত মূল্যায়ন করার চেষ্টা করি। আমি অনেক ভ্রমণ পছন্দ করি। আমি আমার অতিরিক্ত সময় ভ্রমণ করি এবং নতুন মানুষের সাথে পরিচিত হতে ভালোবাসি। নতুন মানুষের সংস্কৃতি এবং তাদের জীবন চলার যে ধরন সেটি পর্যবেক্ষণ করতে ভালোবাসি। আমি সব সময় নতুন কিছু জানার চেষ্টা করে যখনই কোনো কিছু নতুন কিছু দেখতে পাই সেটার উপরে আকর্ষণটি আমার বেশি থাকে।

A5tMjLhTTnj4UJ3Q17DFR9PmiB5HnomwsPZ1BrfGqKbjddgXFQSs49C4STfzSVsuC3FFbePnB7C4GwVRpxUB36KEVxnuiA7vu67jQLLSEq12SJV1etMVkHVQBGVm1AfT2S916muAvY3e7MD1QYJxHDFjsxQDqXN3pTeN2wYBz7e62LRaU5P1fzAajXC55fSNAVZp1Z3Jsjpc4.gif



বিষয়: বিয়ের পর মেয়ের বাবা-মা যদি মেয়ের পাশে না থাকে, ইসলাম কী বলে?

কমিউনিটি : সাহিত্য ক্যানভাস

আন্তরিক ভাবে ধন্যবাদ জানাই এই কমিউনিটির সকল সদস্য কে, ধন্যবাদ...

Sort:  

High-Yield Curation by @steem-seven

Your content has been supported!


Maximize your passive income!
Delegate your SP to us and earn high rewards

Click here to see our Tiered Reward System

Vote Proposal 100Vote Witness @seven.witMeet Speak on Steem

We are the hope!

S7VEN Banner