দমবন্ধ
পুরো শহরটা যেন মানুষে ঠাসা। চিপা-চাপা অলিগলি থেকে রাজপথ—যেদিকেই তাকাই, শুধু মানুষ আর মানুষ। অথচ কোথাও স্বস্তি নেই, অবকাশ নেই, নেই একটু থেমে দাঁড়ানোর সুযোগ। সবাই ছুটছে; কেউ জীবিকার পেছনে, কেউ প্রয়োজনের তাড়নায়, কেউ নিছক ব্যস্ততার অভ্যাসে। রক্ত-মাংসের মানুষগুলোকে দূর থেকে দেখে মনে হয়, একেকটা জীবন্ত রোবট—নির্দেশহীন অথচ অবিরাম ছুটে চলেছে।
খাল-বিল, নদী-নালা, গাছপালা একে একে গায়েব হয়েছে। তাদের জায়গা দখল করে গজিয়ে উঠেছে সারি সারি কংক্রিটের দালান। আধুনিকতার নামে তৈরি হয়েছে অসংখ্য সুসজ্জিত খোপ, আর সেই খোপগুলোতে প্রতিনিয়ত ঠাঁই নিচ্ছে বিচিত্র সব মানুষ।
মনে হয়, দেশের সব মানুষ যেন একসঙ্গে এই শহরে এসে জড়ো হয়েছে—হাঁপ ছেড়ে বাঁচবে বলে। অথচ এখানে এসে শ্বাস নেওয়ার জায়গাটুকুই যেন হারিয়ে ফেলেছে সবাই।
একেবারে জগাখিচুড়ি অবস্থা।
অতিরিক্ত মানুষের চাপে মনে হয়, শহরটা যেকোনো মুহূর্তে বিস্ফোরিত হয়ে যাবে। শহরের বুক চিরে কোথাও মাটির নিচ দিয়ে, কোথাও সাপের মতো এঁকেবেঁকে মাথার ওপর দিয়ে চলে গেছে রাস্তা। আর সেসব পথে সাঁই সাঁই করে ছুটে চলছে অসংখ্য মোটরযান।
একটা-দুটো হলে মেনে নেওয়া যেত। কিন্তু এখানে মোটরযানের সংখ্যাও যেন মানুষের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে , বরং মানুষকেই ছাড়িয়ে গেছে। কত রকমের যানবাহন—বাপ রে বাপ! চোখের পলক ফেলার আগেই চারদিক থেকে ছুটে আসে, আবার মিলিয়েও যায়। যে সামান্য জলপথ কিংবা আকাশটুকু এখনও বাকি আছে, সেখানেও মানুষের দখলদারি।
এই শহরে মানুষ শুধু বিরামহীন ছুটছে আর ছুটছে।
কর্মের পেছনে, জীবিকার পেছনে, প্রয়োজনের পেছনে—অথবা হয়তো নিজের অজান্তেই ব্যস্ততার কাছে আত্মসমর্পণ করে।
একসময় চারপাশের এই দমবন্ধ করা কোলাহল থেকে খানিকটা মুক্তি পেতে দালানের ছাদে উঠলাম। ভেবেছিলাম, অন্তত একটু খোলা আকাশ পাব, দু-দণ্ড স্বস্তির নিঃশ্বাস নেব। কিন্তু যতদূর চোখ গেল, গাছপালার দেখা মিলল না। চারদিকে শুধু কংক্রিটের জঙ্গল। দালানগুলো এমনভাবে দাঁড়িয়ে আছে, যেন দাঁত কেলিয়ে বিদ্রূপ করছে—
“কী খুঁজছিস? গাছ? সব তো কেটে ফেলেছি। বিশুদ্ধ বাতাস? সে তো বহু আগেই শেষ!”
তখনই মনে হলো, এই শহর আসলে মানুষের থাকার জায়গা নয়; মানুষের ছুটে মরার জায়গা।
তারচেয়ে বরং বাড়ির ছেলে, বাড়িতে ফিরে যাওয়াই শ্রেয়।
