নীরবতাও এক ধরনের শক্তি।
আসসালামু-আলাইকুম। আদাব - নমস্কার। মাতৃভাষা বাংলা ব্লগিং এর একমাত্র কমিউনিটি আমার বাংলা ব্লগ এর ভারতীয় এবং বাংলাদেশী সদস্যগণ, আশা করি সবাই ভাল আছেন।
আমরা এমন এক সমাজে বাস করি যেখানে কথা বলাকেই শক্তি মনে করা হয়। যে বেশি কথা বলে, যে নিজের মত জোরে প্রকাশ করতে পারে, তাকেই আত্মবিশ্বাসী ধরা হয়। কিন্তু বাস্তব জীবনে নীরবতার শক্তি অনেক বেশি গভীর ও কার্যকর। সব সময় কথা বলে নিজের অবস্থান প্রমাণ করতে হয় না। অনেক সময় চুপ থাকাই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।
নীরবতা মানে দুর্বলতা নয়। নীরবতা মানে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা। যখন কেউ রাগের মাথায় কথা বলে, তখন সে নিজের ক্ষতি নিজেই করে। আর যে মানুষটা সেই মুহূর্তে চুপ থাকতে পারে, সে পরিস্থিতির ওপর নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখে। রাগের সময় বলা একটি কথা অনেক সম্পর্ক ভেঙে দিতে পারে, অনেক বছরের বিশ্বাস নষ্ট করে দিতে পারে। কিন্তু নীরবতা সেই ক্ষতি থেকে বাঁচাতে পারে।
আমরা প্রায়ই দেখি, মানুষ অন্যের কথায় সহজেই আঘাত পায়। কেউ কিছু বললেই সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিতে ইচ্ছা করে। মনে হয়, এখনই কিছু না বললে হয়তো সবাই ভাববে আমরা দুর্বল। কিন্তু বাস্তবে চুপ থাকা মানে হার মানা নয়। বরং চুপ থেকে পরিস্থিতি বোঝা, মানুষ বোঝা, আর সঠিক সময়ের জন্য অপেক্ষা করাই পরিণত মননের পরিচয়।
নীরবতা মানুষকে ভাবতে শেখায়। যখন আমরা কম কথা বলি, তখন বেশি শুনতে পারি। আর শোনা মানেই শেখা। চারপাশের মানুষ কীভাবে কথা বলে, কীভাবে আচরণ করে, কীভাবে সিদ্ধান্ত নেয়—এসব নীরব চোখেই সবচেয়ে ভালো বোঝা যায়। যারা সব সময় কথা বলে, তারা অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মিস করে ফেলে।
অনেক সময় দেখা যায়, অপ্রয়োজনীয় তর্কে জড়িয়ে আমরা নিজের শান্তি হারিয়ে ফেলি। এমন তর্কের শেষ নেই, ফলও নেই। শুধু মানসিক শক্তি নষ্ট হয়। সেখানে নীরবতা এক ধরনের ঢাল হিসেবে কাজ করে। যে মানুষটা অপ্রয়োজনীয় তর্ক এড়িয়ে চলতে পারে, সে নিজের মানসিক শান্তিকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে।
নীরবতা আত্মসম্মানও রক্ষা করে। সবাই সব কথা বোঝার যোগ্য নয়। সবাইকে সব ব্যাখ্যা দিতে হয় না। নিজের মূল্য বোঝা মানুষ জানে, কোথায় কথা বলা দরকার আর কোথায় চুপ থাকাই সম্মানজনক। যে মানুষ নিজের সীমা জানে, সে অযথা নিজেকে ছোট করে কথা বলে না।
জীবনের অনেক বড় সিদ্ধান্ত নীরবতার মধ্যেই তৈরি হয়। গভীর চিন্তা, আত্মবিশ্লেষণ, নিজের ভুল বোঝা—এসবের জন্য দরকার নীরব সময়। সব সময় শব্দে ভরা জীবন মানুষকে ভেতর থেকে ফাঁকা করে দেয়। মাঝে মাঝে চুপ করে নিজের সঙ্গে বসা খুব জরুরি। সেই নীরব সময়েই মানুষ নিজের আসল চাহিদা, আসল পথ খুঁজে পায়।
নীরবতা সম্পর্ককেও শক্ত করে। সব অনুভূতি শব্দে প্রকাশ করতে হয় না। অনেক সময় পাশে চুপচাপ বসে থাকাটাই সবচেয়ে বড় সমর্থন। কথার চেয়ে উপস্থিতি অনেক বেশি শক্তিশালী হতে পারে। যে সম্পর্ক নীরবতাকেও বুঝতে পারে, সেই সম্পর্ক গভীর হয়।
তবে নীরবতা আর পালিয়ে যাওয়ার মধ্যে পার্থক্য আছে। অন্যায়ের সামনে চুপ থাকা কখনও কখনও ভুল হতে পারে। যেখানে সত্য কথা বলা দরকার, সেখানে সাহস করে কথা বলতে হবে। কিন্তু সব পরিস্থিতিতে কথা বলাই সমাধান নয়। কখন কথা বলতে হবে আর কখন নীরব থাকতে হবে—এই বোধটাই মানুষকে পরিণত করে।
আজকের কোলাহলপূর্ণ জীবনে নীরব থাকা সহজ নয়। চারদিকে মতামত, মন্তব্য, বিচার—সব মিলিয়ে মানুষ সব সময় চাপের মধ্যে থাকে। এই চাপের ভিড়ে নীরবতা হয়ে উঠতে পারে নিজের জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয়। সেখানে কেউ বিচার করে না, কেউ প্রশ্ন করে না। সেখানে শুধু তুমি আর তোমার মন।
শেষমেশ বলা যায়, নীরবতা দুর্বলতার চিহ্ন নয়, বরং আত্মনিয়ন্ত্রণের শক্ত প্রমাণ। যে মানুষ নীরব থাকতে জানে, সে নিজের আবেগ, রাগ আর কথাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। আর যে নিজের ভেতরটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, সে জীবনের অনেক লড়াই চুপচাপ জিতেও যেতে পারে।


| 250 SP | 500 SP | 1000 SP | 2000 SP | 5000 SP |
VOTE @bangla.witness as witness

OR

