পৃথিবীতে সবাই অবুঝ, শুধু আমিই কি ঠিক?
আসসালামু-আলাইকুম। আদাব - নমস্কার। মাতৃভাষা বাংলা ব্লগিং এর একমাত্র কমিউনিটি আমার বাংলা ব্লগ এর ভারতীয় এবং বাংলাদেশী সদস্যগণ, আশা করি সবাই ভাল আছেন।
মাঝরাতে কখনো কি একা বারান্দায় দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে মনে হয়েছে, এই বিশাল পৃথিবীতে আপনাকে বোঝার মতো কেউ নেই? কখনো কি মনে হয়েছে, আপনার চারপাশের মানুষগুলো বড্ড স্বার্থপর, বড্ড অবুঝ? আপনি দিনের পর দিন গলা ফাটিয়ে, নিজের আবেগ উজাড় করে দিয়েও কাউকে নিজের জায়গাটা বোঝাতে পারছেন না। তখন বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে, আর মস্তিষ্ক একটা সিদ্ধান্তে উপনীত হয়— "পৃথিবীতে সবাই অবুঝ, শুধু আমিই ঠিক!" এই অনুভূতিটা আমাদের সবার জীবনের কোনো না কোনো অধ্যায়ে একবার হলেও কড়া নাড়ে। আমরা প্রত্যেকেই নিজের জীবনের গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র। আর একজন কেন্দ্রীয় চরিত্র তো কখনো ভুল হতে পারে না, তাই না? কিন্তু এই যে নিজেকে সবসময় নিখুঁত আর বাকি সবাইকে দোষী ভাবার এক অদ্ভুত মানসিকতা, এটা কি আসলেই বাস্তবসম্মত? নাকি এটা আমাদের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গির এক বিশাল ভ্রান্তি? মানুষের সবচেয়ে বড় জন্মগত স্বভাব হলো নিজেকে বাঁচিয়ে চলা—শুধু শারীরিকভাবে নয়, মানসিকভাবেও। আমরা যখন কোনো ভুল করি, আমাদের মস্তিষ্ক সাথে সাথে দশটা অজুহাত তৈরি করে ফেলে এটা প্রমাণ করার জন্য যে, পরিস্থিতি আমাকে দিয়ে এই ভুলটা করিয়েছে, আসলে আমার কোনো দোষ ছিল না। আমি তো ভালোই চেয়েছিলাম! কিন্তু ঠিক একই ভুল যখন অন্য কেউ করে, তখন আমরা তার পরিস্থিতি বা পেছনের গল্পটা দেখার চেষ্টা করি না। আমরা সরাসরি তার চরিত্র বা মানসিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বসি। আমরা নিজেদের বিচার করি আমাদের উদ্দেশ্য দিয়ে, আর অন্যকে বিচার করি তাদের কাজ দিয়ে। আমি যখন কারো সাথে খারাপ ব্যবহার করি, আমি ভাবি, আমার মন মেজাজ খারাপ ছিল, ও আমাকে রাগিয়েছে তাই আমি এমন করেছি। কিন্তু অন্য কেউ যখন আমার সাথে খারাপ ব্যবহার করে, তখন আমি ভাবি, মানুষটাই খারাপ, এর কোনো কাণ্ডজ্ঞান নেই। এই মানসিকতাই আমাদের ভেতরে এই বোধের জন্ম দেয় যে, আমিই সবসময় ঠিক, আর বাকি দুনিয়া অবুঝ। আমরা যখন কাউকে কিছু বোঝাতে যাই, আমরা আশা করি সে ঠিক আমার চোখ দিয়েই পৃথিবীটা দেখবে। আমার কষ্টটা ঠিক সেভাবেই অনুভব করবে, যেভাবে আমি করছি। কিন্তু বাস্তবতা হলো, দুজন মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি কখনোই শতভাগ এক হতে পারে না। আপনি হয়তো একটা বিষয়কে এক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখছেন, কিন্তু আপনার উল্টো দিকে দাঁড়ানো মানুষটা সেটাকে সম্পূর্ণ ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখছে। আপনি তাকে অবুঝ ভাবছেন, ভাবছেন সে ইচ্ছে করে ঘাড়ত্যাড়ামি করছে। আর সেও ঠিক একই কথা ভাবছে আপনার সম্পর্কে! আমরা ভুলে যাই যে, প্রতিটি মানুষের বড় হয়ে ওঠা, তার জীবনের অভিজ্ঞতা, তার লড়াই—সবকিছু আলাদা। তাই একটা নির্দিষ্ট বিষয়ে তার প্রতিক্রিয়াও আমার চেয়ে আলাদা হবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আমরা সেই ভিন্নতাকে মেনে নিতে পারি না। আমরা চাই সবাই আমাদের ছাঁচে ঢালাই করা পুতুলের মতো আচরণ করুক। আর তা না হলেই আমরা তাদের গায়ে অবুঝ ট্যাগ লাগিয়ে দিই। সবাই ভুল, আমি ঠিক—এই চিন্তাধারা প্রথম দিকে অহংকারকে খুব তৃপ্তি দেয়। মনে হয়, আমি কত মহান, আমি কত বুঝি, আর এরা সব বোকা! কিন্তু এই অহংকারের দেয়াল যখন উঁচু হতে শুরু করে, তখন আমরা নিজেদের অজান্তেই একাকীত্বের এক অন্ধকার প্রকোষ্ঠে বন্দি হয়ে পড়ি। যে মানুষটা ভাবে পৃথিবীর সবাই অবুঝ, সে ধীরে ধীরে সবার কাছ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেয়। কারণ সে কারো সাথেই আর মানসিক সংযোগ স্থাপন করতে পারে না। সে ভাবে, এদের সাথে কথা বলাই বেকার, এরা তো আমার কথা বুঝবেই না। এভাবে একসময় দেখা যায়, মানুষটা ভিড়ের মাঝে থেকেও ভীষণ একা। তার বুকের ভেতর জমে থাকা কথাগুলো শোনার মতো কেউ থাকে না। কারণ সে নিজেই তার চারপাশের মানুষদের অযোগ্য আর অবুঝ ঘোষণা করে দূরে ঠেলে দিয়েছে। সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা লাগে তখন, যখন আপনি বুঝতে পারেন যে, মুদ্রার একটা উল্টো পিঠও আছে। আপনি যাদের অবুঝ বলছেন, যাদের কাঠগড়ায় দাঁড় করাচ্ছেন, তাদের জীবনের গল্পে কিন্তু আপনিই সেই অবুঝ মানুষটা! যে মানুষটার ওপর আপনি প্রচন্ড রেগে আছেন এই ভেবে যে সে আপনাকে একটুও বুঝল না, সেই মানুষটাও হয়তো রাতে নিজের ঘরে বসে আপনার ওপর রাগ করে ভাবছে, আমি এত করে বললাম, তবু মানুষটা আমার পরিস্থিতিটা একটুও বুঝল না! অর্থাৎ, আমরা সবাই নিজের নিজের জায়গায় বসে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করার খেলায় মেতে আছি। আমরা কেউ কারো জায়গা থেকে পরিস্থিতি দেখার চেষ্টা করছি না। সবাই নিজের আয়নায় নিজের প্রতিবিম্ব দেখে মুগ্ধ হচ্ছি, আর অন্যের দিকে আঙুল তুলছি। আসলে কেউ অবুঝ নয়, সবাই শুধু নিজের নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে নিজের মতো করে ঠিক। আপনার কাছে যেটা বিশাল বড় আঘাত, অন্যের কাছে সেটা হয়তো খুব সাধারণ একটা ব্যাপার। আবার অন্যের যে কথায় আপনি বিরক্ত হচ্ছেন, সেটা হয়তো তার জীবনের সবচেয়ে বড় যন্ত্রণার প্রকাশ। আমরা সবাই নিজেদের বেদনার চশমা পরে পৃথিবীটাকে দেখি, আর তাই অন্যদের ব্যথা আমাদের চোখে পড়ে না। জীবনকে সুন্দর করতে হলে, এই আমিই ঠিক আর সবাই ভুল মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। এটা একদিনে হবে না, কিন্তু চেষ্টা করতে হবে। প্রথমেই মেনে নিতে শিখুন যে—আপনি নিখুঁত নন। আপনারও ভুল হতে পারে, আপনারও বোঝার ঘাটতি থাকতে পারে। অন্যের ওপর বিরক্ত হওয়ার আগে একটু তার জায়গায় নিজেকে দাঁড় করিয়ে দেখুন। হয়তো তার দিক থেকে সে-ও ঠিক। পৃথিবীতে সবকিছু সাদা আর কালো নয়, মাঝে অনেক ধূসর জায়গাও আছে। যেখানে আপনিও একটু ভুল, সেও একটু ভুল; আবার আপনিও কিছুটা ঠিক, সেও কিছুটা ঠিক। সবাইকে সব কথা বোঝাতে হবে, এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। মানুষ আপনাকে ভুল বুঝতেই পারে, আর সেটা মানুষের স্বভাব। কিন্তু তাই বলে পৃথিবীর সবাইকে অবুঝ ভেবে নিজের মনের দরজা বন্ধ করে দেওয়াটা বোকামি। যেদিন আপনি এই সত্যটা মেনে নিতে পারবেন যে, পৃথিবীর কেউই শতভাগ ঠিক বা ভুল নয়, সেদিন দেখবেন বুকের ওপর থেকে এক বিশাল পাথর নেমে গেছে। কারো প্রতি আর কোনো রাগ থাকবে না, কোনো অভিযোগ থাকবে না। নিজেকে সবসময় ঠিক প্রমাণের এই ক্লান্তিকর ইঁদুর দৌড় থেকে এবার একটু বিশ্রাম নিন। অবুঝ পৃথিবীর দিকে আঙুল তোলা বন্ধ করে, একটু বোঝার চেষ্টা করুন। দেখবেন, পৃথিবীটা ততটাও খারাপ নয়, আর মানুষগুলোও ততটা অবুঝ নয়। তারা শুধু আপনার মতো করে ভাবতে পারে না—আর এই ভিন্নতাটাই তো পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর বিষয়। এই মেনে নেওয়ার ক্ষমতাটাই আপনাকে সত্যিকারের মানসিক প্রশান্তি এনে দেবে।
সকলকে ধন্যবাদ অনুচ্ছেদ টি পড়ার জন্য।


Support @heroism Initiative by Delegating your Steem Power
| 250 SP | 500 SP | 1000 SP | 2000 SP | 5000 SP |
VOTE @bangla.witness as witness

OR


Thank you for sharing on steem! I'm witness fuli, and I've given you a free upvote. If you'd like to support me, please consider voting at https://steemitwallet.com/~witnesses 🌟