সীমা অতিক্রমকারীকে আল্লাহও পছন্দ করেন না
আসসালামু-আলাইকুম। আদাব - নমস্কার। মাতৃভাষা বাংলা ব্লগিং এর একমাত্র কমিউনিটি আমার বাংলা ব্লগ এর ভারতীয় এবং বাংলাদেশী সদস্যগণ, আশা করি সবাই ভাল আছেন।
মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন এই মহাবিশ্বকে একটি সুনির্দিষ্ট নিয়ম ও অপরিসীম ভারসাম্যের ওপর সৃষ্টি করেছেন। মানবজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেও তিনি এমন কিছু সীমারেখা নির্ধারণ করে দিয়েছেন, যা মানুষের দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণের জন্য অপরিহার্য। পবিত্র কোরআনুল কারিমে আল্লাহ তায়ালা সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন, "তোমরা সীমালঙ্ঘন করো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ সীমালঙ্ঘনকারীদের পছন্দ করেন না।" এই একটি বাক্যের মাঝেই লুকিয়ে আছে ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক এবং বৈশ্বিক শান্তির মূলমন্ত্র। সীমা অতিক্রম বা সীমালঙ্ঘন বলতে কেবল ধর্মীয় বিধিবিধান অমান্য করাকেই বোঝায় না, বরং মানুষের দৈনন্দিন জীবন, আচরণ, অর্থব্যায় এবং পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও ভারসাম্য নষ্ট করাকে বোঝায়।
ইসলাম সর্বদা মধ্যপন্থার ধর্ম। ইসলামে চরমপন্থা বা বাড়াবাড়ির কোনো স্থান নেই। সীমা অতিক্রম করার অর্থ হলো আল্লাহ প্রদত্ত বৈধ অধিকারের বাইরে গিয়ে অন্যের অধিকারে হস্তক্ষেপ করা, নিজের ক্ষমতার অপব্যবহার করা অথবা স্রষ্টার নির্ধারিত হারামকে হালাল কিংবা হালালকে হারাম সাব্যস্ত করা। মানুষের স্বভাবজাত প্রবণতা হলো সে যখন ক্ষমতা বা সম্পদের অধিকারী হয়, তখন সে নিজেকে সর্বেসর্বা ভাবতে শুরু করে। তার এই অহংকার ও দম্ভ তাকে সীমালঙ্ঘনের দিকে ধাবিত করে। ইতিহাস সাক্ষী, ফেরাউন, নমরুদ, কারুন থেকে শুরু করে যুগে যুগে যত অত্যাচারী শাসকের পতন হয়েছে, তার মূল কারণ ছিল তাদের সীমালঙ্ঘন। তারা ভেবেছিল তাদের ক্ষমতা চিরস্থায়ী, কিন্তু আল্লাহ তায়ালা তাদের চরম পরিণতি দিয়ে প্রমাণ করেছেন যে, তিনি কখনোই অহংকারী ও সীমা অতিক্রমকারীদের প্রশ্রয় দেন না।
অর্থনৈতিক জীবনেও সীমা অতিক্রম একটি ভয়াবহ ব্যাধি। ইসলাম মানুষকে হালাল উপার্জনের নির্দেশ দিয়েছে এবং অপচয় করতে কঠোরভাবে নিষেধ করেছে। যারা সম্পদশালী, তাদের সম্পদের ওপর গরিবের হক রয়েছে। কিন্তু মানুষ যখন কৃপণতা করে অথবা নিজের সম্পদকে অহংকারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে বিলাসিতায় মত্ত হয়, তখন সে আল্লাহর নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করে। আল্লাহ কোরআনে বলেছেন, "তোমরা খাও এবং পান করো, কিন্তু অপচয় করো না।" অপচয়কারীকে শয়তানের ভাই হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। সুতরাং, নিজের প্রয়োজন মেটানোর পর উদ্বৃত্ত সম্পদ সমাজের কল্যাণে ব্যয় করাই হলো ভারসাম্যপূর্ণ জীবন। সম্পদের মোহে পড়ে অন্যের হক নষ্ট করা, দুর্নীতি করা বা মাপে কম দেওয়াও এই সীমালঙ্ঘনের আওতাভুক্ত।
আমাদের কথাবার্তা এবং আচার-আচরণেও সীমা অতিক্রম করার প্রবণতা দেখা যায়। মানুষের সাথে রুক্ষ আচরণ করা, বিনা কারণে কাউকে অপমান করা, গীবত বা পরনিন্দা করা এবং মিথ্যা অপবাদ দেওয়া ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। রাগের বশবর্তী হয়ে আমরা অনেক সময় এমন কথা বলে ফেলি যা অন্যের হৃদয়ে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করে। প্রতিশোধ নিতে গিয়ে প্রাপ্যের চেয়ে বেশি শাস্তি দেওয়া বা জুলুম করাও সীমা অতিক্রম। ইসলাম আমাদের শিক্ষা দেয়, কেউ অন্যায় করলে তাকে ক্ষমা করে দেওয়া উত্তম। আর যদি বিচার চাইতেই হয়, তবে তা যেন কখনোই অন্যায়ের মাত্রাকে ছাড়িয়ে না যায়। নিজের রাগ এবং আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করে সংযত আচরণ করাই হলো একজন প্রকৃত মুমিনের বৈশিষ্ট্য।
সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় জীবনেও সীমা অতিক্রমের পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ। সমাজ বা রাষ্ট্রের দায়িত্বে যারা থাকেন, তাদের প্রধান কর্তব্য হলো ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু যখন কোনো শাসক বা নেতা ক্ষমতার অপব্যবহার করে জনগণের ওপর জুলুম করেন, তখন তিনি আল্লাহর নির্ধারিত সীমা চরমভাবে লঙ্ঘন করেন। ইসলামি শরিয়তে বিচারের ক্ষেত্রেও কঠোরভাবে ইনসাফ বা ন্যায়বিচার কায়েম করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অপরাধীর অপরাধের মাত্রা যতটুকু, তার শাস্তিও ঠিক ততটুকুই হওয়া বাঞ্ছনীয়। শাস্তির ক্ষেত্রেও বাড়াবাড়ি করাকে আল্লাহ নিষেধ করেছেন। সমাজে যখন ন্যায়বিচারের অভাব ঘটে এবং সবল দুর্বলকে শোষণ করতে শুরু করে, তখন সেই সমাজে আল্লাহর গজব নেমে আসে। অন্যের জমি দখল করা, এতিমের সম্পদ আত্মসাৎ করা, কিংবা ক্ষমতার জোরে কাউকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো- এ সবই সীমালঙ্ঘনের সুস্পষ্ট উদাহরণ, যা আল্লাহ কখনোই ক্ষমা করবেন না যতক্ষণ না মজলুম ব্যক্তি তাকে ক্ষমা করে।
পারিবারিক জীবনে স্বামী-স্ত্রী, পিতা-মাতা এবং সন্তানদের মাঝেও অধিকারের একটি সীমারেখা রয়েছে। অনেক সময় স্বামী তার স্ত্রীর ওপর অন্যায়ভাবে কর্তৃত্ব ফলায়, শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন করে, যা সম্পূর্ণভাবে ইসলাম বিরোধী। একইভাবে স্ত্রীও যদি স্বামীর প্রতি অবাধ্য হয় এবং পরিবারের শান্তি বিনষ্ট করে, তবে তা সীমা অতিক্রমের পর্যায়ে পড়ে। পিতা-মাতাকে সম্মান করার ক্ষেত্রেও আল্লাহ স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন যে তাদের সাথে খারাপ আচরণ করা যাবে না। অন্যদিকে, সন্তানদের প্রতিও পিতা-মাতার দায়িত্ব রয়েছে; তাদের সঠিক শিক্ষা দেওয়া এবং স্নেহ-মমতা দিয়ে বড় করা পিতা-মাতার কর্তব্য। এই পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে যেকোনো এক পক্ষ যখন নিজের দায়িত্ব পালন না করে কেবল অধিকার আদায়ের জন্য জুলুম করে, তখনই পারিবারিক ভারসাম্য নষ্ট হয়। আল্লাহ চান প্রতিটি পরিবারে যেন দয়া, ভালোবাসা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের মাধ্যমে একটি সুন্দর পরিবেশ বজায় থাকে।
এমনকি পরিবেশ এবং প্রকৃতির সাথে আচরণের ক্ষেত্রেও আল্লাহ আমাদের সীমালঙ্ঘন করতে নিষেধ করেছেন। বিনা কারণে গাছ কাটা, পশু-পাখিকে কষ্ট দেওয়া, পানি বা প্রাকৃতিক সম্পদের অপচয় করাও এক ধরনের সীমা অতিক্রম। এই পৃথিবী এবং এর সকল সম্পদ আল্লাহ মানুষের কল্যাণের জন্য সৃষ্টি করেছেন, তবে তা যথেচ্ছভাবে ব্যবহার করে ধ্বংস করার অধিকার কাউকে দেননি। পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখা এবং আল্লাহর সৃষ্টির প্রতি সদয় হওয়া একজন প্রকৃত মুমিনের দায়িত্ব। যখন মানুষ নিজের সাময়িক লাভের জন্য বনজঙ্গল ধ্বংস করে বা নদীদূষণ করে, তখন এর ক্ষতিকর প্রভাব পুরো মানবজাতির ওপর পড়ে, যা এক ধরনের বৈশ্বিক সীমালঙ্ঘন।
ধর্মীয় জীবনেও সীমালঙ্ঘন বা বাড়াবাড়ি করা নিষিদ্ধ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, তোমরা ধর্মে বাড়াবাড়ি করা থেকে বিরত থাকো, কারণ তোমাদের পূর্ববর্তীরা ধর্মে বাড়াবাড়ি করার কারণেই ধ্বংস হয়ে গেছে। অনেক সময় মানুষ অতিরিক্ত সওয়াবের আশায় এমন সব ইবাদতের পন্থা আবিষ্কার করে বা নিজের ওপর এমন কষ্ট চাপিয়ে নেয়, যা ইসলাম অনুমোদন করে না। হালাল বস্তুকে নিজের জন্য হারাম করে নেওয়া বা দ্বীনের সহজ বিষয়গুলোকে মানুষের জন্য কঠিন করে তোলা আল্লাহর অপছন্দনীয় কাজ। ইবাদতের ক্ষেত্রেও নবীজির (সা.) সুন্নাহ এবং প্রদর্শিত পথের ভেতরে থাকাই হলো আল্লাহর আনুগত্য। এর বাইরে গিয়ে নিজের মনগড়া কোনো নিয়ম চালু করা চরম সীমালঙ্ঘন।
পরিশেষে বলা যায়, আল্লাহ তায়ালা আমাদের যে জীবন দিয়েছেন তা একটি আমানত। এই জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে আমাদের খেয়াল রাখতে হবে যেন আমরা স্রষ্টার বেঁধে দেওয়া সীমারেখা অতিক্রম না করি। ব্যক্তিগত জীবনে বিনয়ী হওয়া, অপরের অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা, কথাবার্তায় সংযত হওয়া এবং ধর্মে মধ্যপন্থা অবলম্বন করাই হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের পথ। যে ব্যক্তি নিজের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহর নির্ধারিত সীমার মধ্যে আবদ্ধ থাকে, সে দুনিয়াতে পায় মানসিক প্রশান্তি এবং আখিরাতে লাভ করে চিরস্থায়ী সফলতা। আমাদের সকলের উচিত সর্বপ্রকার সীমালঙ্ঘন থেকে নিজেদের দূরে রেখে আল্লাহর প্রিয় বান্দা হিসেবে নিজেদের গড়ে তোলা।
সকলকে ধন্যবাদ অনুচ্ছেদ টি পড়ার জন্য।


| 250 SP | 500 SP | 1000 SP | 2000 SP | 5000 SP |
VOTE @bangla.witness as witness

OR



This post has been upvoted by @italygame witness curation trail
If you like our work and want to support us, please consider to approve our witness
Come and visit Italy Community