বিয়ে বাড়ির ফ্রি বুফে: এক বাঙালি মহাকাব্যের ব্যবচ্ছেদ

in আমার বাংলা ব্লগ4 days ago

আসসালামু-আলাইকুম। আদাব - নমস্কার। মাতৃভাষা বাংলা ব্লগিং এর একমাত্র কমিউনিটি আমার বাংলা ব্লগ এর ভারতীয় এবং বাংলাদেশী সদস্যগণ, আশা করি সবাই ভাল আছেন।



Gemini_Generated_Image_1oibix1oibix1oib.png

বাঙালি জীবনে বিয়ে বাড়ির নিমন্ত্রণ মানেই মনের কোণে এক চিলতে আনন্দ আর পেটের কোণে বিশাল এক শূন্যস্থান তৈরি করা। তবে সময়ের বিবর্তনে টেবিল সিস্টেমের চিরাচরিত প্রথা এখন প্রায় বিলুপ্তির পথে, আর সেই জায়গা দখল করে নিয়েছে আধুনিক ‘বুফে সিস্টেম’। এই বুফে মানেই হচ্ছে ‘ফ্রি ফর অল’—যেখানে প্লেট হাতে নিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে খাবার সংগ্রহ করাটা কেবল ভোজন নয়, বরং এক অঘোষিত রণকৌশল। বিয়ে বাড়িতে পা রাখার পর থেকেই একজন খাঁটি বাঙালির মিশন শুরু হয়। বর-কনের সাজগোজ বা ডেকোরেশন দেখার চেয়ে তখন সবার সজাগ দৃষ্টি থাকে ডাইনিং হলের প্রবেশদ্বারের দিকে। গেট খোলার সংকেত পাওয়া মাত্রই শুরু হয় এক নীরব দৌড় প্রতিযোগিতা, কারণ অভিজ্ঞ ভোজনরসিকরা জানেন যে প্রথম দিকে লাইনে দাঁড়াতে না পারলে পছন্দের পিস খুঁজে পাওয়াটা দুষ্কর হয়ে পড়বে।

রণপ্রস্তুতির এই পর্যায়ে প্লেট হাতে নেওয়াটা এক বিশেষ শিল্প। বুফে প্লেটগুলো আকারে বেশ বড় হলেও বাঙালির উচ্চাকাঙ্ক্ষার সামনে সেগুলো সব সময়ই ছোট মনে হয়। সাধারণত সালাদ বা চাটনি দিয়ে প্লেটের যাত্রা শুরু হলেও একজন ঝানু বুফে-যোদ্ধা কখনোই সালাদ নিয়ে প্লেটের মহামূল্যবান জায়গা নষ্ট করতে চান না। আসল রোমাঞ্চ শুরু হয় পোলাও বা কাচ্চির কাউন্টারে গিয়ে। সেখানে বিরিয়ানির পাহাড় বানিয়ে তার ওপর যখন আস্ত এক পিস চিকেন রোস্ট, পাশে খাসির রেজালার গ্রেভি আর এক কোণায় কাবাব বসানো হয়, তখন প্লেটের অবস্থা অনেকটা মহাকাশ বিজ্ঞানের ‘ব্যালেন্স’ সূত্রের মতো হয়ে দাঁড়ায়। যেকোনো মুহূর্তে এই খাবারের পাহাড় ধসে পড়ার সম্ভাবনা থাকলেও অদ্ভুত এক জাদুকরী ভারসাম্য বজায় রেখে বাঙালি সেই প্লেট নিয়ে টেবিলের দিকে যাত্রা করে।

তবে এই ভোজন যুদ্ধের মাঝখানেও বিপত্তি কম নয়। পেট ভরে কাচ্চি নিয়ে যখন একটু শান্তিতে বসার জায়গা খুঁজছেন, ঠিক তখনই দেখা হয়ে যেতে পারে কোনো অতি-উৎসাহী দূর-সম্পর্কের আত্মীয়ের সাথে। তিনি আপনার খাবারের পাহাড়ের দিকে একবার আড়চোখে তাকিয়ে হয়তো পরম মমতায় জিজ্ঞেস করবেন—"বাবা, এত কম খাচ্ছ কেন?" আর তার ঠিক পরেই আসবে সেই অবধারিত ‘অশুভ’ প্রশ্ন—"তা তোমার বিয়েটা কবে? আমরা কবে তোমার বাড়ির বুফে খাব?" এমন অবস্থায় মুখের কাচ্চি গেলাটা যেমন কঠিন হয়ে পড়ে, তেমনি হাসি মুখে উত্তর দেওয়াটাও এক অগ্নিপরীক্ষা। তবুও এই বিড়ম্বনা মেনে নিয়েই বাঙালি তার খাবারের তৃপ্তিতে মনোযোগ দেয়।

খাবার পরবর্তী পানীয় এবং মিষ্টান্নের কাউন্টারগুলোতে গেলে মনে হয় কোনো এক মরুভূমি থেকে পরিশ্রান্ত কাফেলা ফিরে এসেছে। কোল্ড ড্রিংকস বা বোরহানির গ্লাস এমনভাবে হাতে নেওয়া হয় যেন সারা রাতের পিপাসা এখানেই মেটাতে হবে। ডার্ক চকোলেট আইসক্রিম কিংবা জর্দার ফিউশন বানিয়ে যখন শেষ পাতে তৃপ্তির ঢেকুর তোলা হয়, তখনই যেন মনে হয় বিয়ে বাড়ির আসাটা সার্থক। দিনশেষে যদিও অনেক খাবার প্লেটে নষ্ট হয়, তবুও বাঙালির চিরন্তন দর্শন হলো—নিজের ভাগেরটা যেন অন্য কেউ কেড়ে নিতে না পারে। হাত ধুয়ে পানের খিলি মুখে দিয়ে যখন কেউ মন্তব্য করে, "খাবারটা মন্দ ছিল না, তবে বিরিয়ানির চালটা আরেকটু ঝরঝরে হতে পারতো," ঠিক তখনই একটি আদর্শ বিয়ে বাড়ির বুফে অভিজ্ঞতার সফল সমাপ্তি ঘটে। এই হাহাকার, হুড়োহুড়ি আর তৃপ্তির মিশুলেই বেঁচে আছে আমাদের সামাজিক উৎসবের আসল আমেজ।


সকলকে ধন্যবাদ অনুচ্ছেদ টি পড়ার জন্য।

1000038736.webp


Support @heroism Initiative by Delegating your Steem Power

250 SP500 SP1000 SP2000 SP5000 SP

Heroism_3rd.png

VOTE @bangla.witness as witness


witness_vote.png

OR

SET @rme as your proxy

witness_proxy_vote.png

Sort:  

This post has been upvoted by @italygame witness curation trail


If you like our work and want to support us, please consider to approve our witness




CLICK HERE 👇

Come and visit Italy Community