অসময়ে প্রস্থান
ঘুম থেকে উঠে মুঠোফোনটা হাতে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নিউজফিড স্ক্রল করতে গিয়েই মানসিকভাবে সজোরে ধাক্কা খেলাম। খানিকক্ষণ নির্বাক হয়ে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থেকে অতীতের স্মৃতিগুলো সযত্নে নেড়েচেড়ে দেখলাম। চোখের কোণ বেয়ে কখন যে জল গড়িয়ে পড়েছে, বুঝতেই পারিনি।
ঝিলপাড়া আর কুঠিবাড়ির দূরত্ব খুব আহামরি কিছু নয়—সামান্য পায়ে হাঁটার পথ। অথচ সেই সামান্য পথজুড়ে ছড়িয়ে আছে শৈশবের কত শত স্মৃতি! কানাপুকুর, কুঠিবাড়ি মাঠ, ঝিলের পাড়—সবকিছুই যেন আমাদের ছেলেবেলার জীবন্ত অধ্যায়।
ছোট ভাই-ব্রাদার, সমবয়সী কিংবা খানিকটা বড়দের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল নিখাদ বন্ধুত্বের মতো। কখনো মনে হয়নি, আমাদের মাঝখানে কোনো দূরত্ব আছে,পায়ে হাঁটা সামান্য পথটুকুও যেন আমাদের আলাদা করতে পারেনি।
শৈশবটা বলতে গেলে ওই কুঠিবাড়ি আর ঝিলপাড়ার পরিসরেই সদানন্দে কেটেছে। নাজমুলের সঙ্গে পরিচয়ও আজকের নয়—বহু পুরোনো। বয়সে ছোট হলেও সম্পর্কটা ছিল বেশ প্রাণবন্ত। মাদ্রাসার ঠিক পেছনেই ছিল ওদের বসতি।
সময় গড়িয়েছে, আর সেই সঙ্গে সম্পর্কগুলোর ওপরও দূরত্বের ধুলো জমেছে। পড়াশোনা কিংবা কর্মের তাগিদে শৈশবের স্মৃতিতে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর সঙ্গে পরবর্তীতে সেভাবে আর যোগাযোগ করে ওঠা হয়নি।
তারপরও ২০১৮-১৯ সালের দিকে চেম্বার করার সময় নাজমুল বেশ কয়েকবার যোগাযোগ করেছিল। ওর ছোট ভাই তখন দাঁতের ব্যথায় ভুগছিল। একসময় পলাশবাড়ী থেকে ও নিজেই ছোট ভাইকে সঙ্গে নিয়ে দেখা করতে এসেছিল। সাধ্যমতো সঠিক পরামর্শ দেওয়ার চেষ্টা করেছিলাম। সেটাই ছিল আমাদের শেষ দেখা।
এরপর আর বাস্তবে দেখা হয়ে ওঠেনি। টুকটাক যে কথোপকথন হয়েছে, তা ওই মেসেঞ্জারের গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ ছিল।
যতদূর শুনেছিলাম, পরবর্তীতে ওর পরিবার গোবিন্দগঞ্জ ছেড়ে পলাশবাড়ীতে বসবাস করত, আর কর্মের কারণে নাজমুল থাকত ঢাকায়।
ইশ! আজ সকালটা যদি একটু অন্যরকমভাবে শুরু হতো! মানসিকভাবে এমন সজোরে ধাক্কা যদি না খেতে হতো, তাহলে কী-ই বা এমন ক্ষতি হতো?
শৈশবের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর এমন আকস্মিক বিয়োগ শুধু মানসিকভাবে সজোরে আঘাতই করে না বরং ভেতরটাকে যেন রক্তাক্ত করে দিয়ে যায়।
এত দ্রুত চলে না গেলেই পারতি, নাজমুল। আর একবার দেখা হলে এমন কী-ই বা মন্দ হতো? কত কথা তো এখনো জমে আছে—সেগুলো তো আর বলাই হয়ে উঠল না, রে ভাই!
